‘রাঘব চ্যাটার্জী’ মানেই বাঙালির কাছে নস্ট্যালজিয়ার টান

‘রাঘব চ্যাটার্জী’ মানেই বাঙালির কাছে নস্ট্যালজিয়ার টান। গানের জগতে কাটিয়ে ফেলেছেন প্রায় ২৪ বছর। সাত সুর নিয়ে তাঁর জীবন। একই সঙ্গে তিনি ভ্রমণ আর ভোজন রসিক। সুরের মতোই পরীক্ষানিরিক্ষা করেন এই দুই শখ নিয়েও। ‘টলিকথা’-র আড্ডায় গায়ক রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের মুখে শুনুন তাঁর অজানা গল্প

প্রঃ রাঘব চ্যাটার্জী মানেই নস্ট্যালজিয়া- এটা কি নিজে বদলাওনি বলেই কোথাও গিয়ে ধারাটা বদলায়নি?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ না, ধারাটা অবশ্যই বদলেছে। আমি যেমন পুরনো ভাবনা নিয়ে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকে কাজ করেছি, তেমনই নতুন ধরনের সাউন্ড, নতুন সিঙ্গগিং স্টাইল প্রতিটা জিনিসে নিজেকে নিজের কাজে নতুনত্বের ধারা রাখার চেষ্টা করেছি। তার সঙ্গে আমার নিজস্বতা যা আমার ইউএসপি সেগুলো এবং নিজের ভাল লাগার যে সবচেয়ে প্ৰিয় জায়গাগুলো সেটা রেখেই নিজের গান বাজনা বজায় করছি এতদিন।

প্রঃ পুজোর গান, এলবাম, ক্যাসেট এই দিনগুলো কতটা মিস করো এখনও?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ মিস করি ঠিকই কিন্তু আমি পুরনো জিনিসটাই ধরে রেখে দেব এমন মানসিকতার লোক নই। আমরা ছোটবেলায় রেকর্ড-এ গান শুনতাম, রেকর্ড ছিল বাড়িতে। তারপর যখন ক্যাসেট এল তখন খুব ইন্টারেস্টিং লাগল। তারপর সিডি এল, তার মধ্যে একটা অন্য ধরনের মজা পেলাম, অন্য সাউন্ড ক্লারিটি, ব্রাইটনেস পেলাম অনেক বেশি। তারপর ডিজিটাল। ডিজিটালে যে কোনও সময়, যে কোনও আর্টিস্টকে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসে শুনতে পাই। এটা যেন অদ্ভুত, স্বর্গ হাতে পাওয়া। কোনওদিন ভাবতেও পারিনি এটা সম্ভব। প্রত্যেকটা জিনিসের যেমন কিছু ড্র-ব্যাক আছে, মাইনাস পয়েন্ট আছে হয়ত যারা নেগেটিভটা দ্যাখে, কিন্তু আমি সব সময় পজেটিভটা দেখি যে এটার জন্য পজেটিভলি আমরা কী ভাল পেলাম, আমি সব সময় পজেটিভ দিকগুলো বেশি এনজয় করি।

প্রঃ যদি গান কম্পোজ করার একটা অন্য ধারা যদি আপনি করেন তাহলে কাকে দিয়ে গাওয়াবেন?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ আমি ভারতীয় সঙ্গীত, বিদেশী সঙ্গীত প্রচুর শুনি। ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক শুনি বা সেই ধরনের কম্পোজিশন করতে চাই, তেমনি লোকসঙ্গীত, আধুনিক, তার যে ফরম্যাট, পুরনো ফিল্মি গানের যে নিজস্ব ফরম্যাট তার সঙ্গে রক এন্ড রোল, এই সময়ের নতুন ধরনের সাউন্ড, পপ, রক, জ্যাজ, ব্লুজ, সব ধরনের মিউজিককের ভাল জিনিসটা ইনকর্পোরেট করার চেষ্টা করেছি। তার থেকে কিছু শিখে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছি। সুতরাং এমন এমন কম্পোজিশন আমার রয়েছে কোনও গান হয়ত শ্রেয়া গাইলে ভাল লাগবে আবার এমন কোনও গান আছে যেটা সোনু নিগম কিংবা অরিজিৎ সিং গাইলে ভাল লাগবে। গান আমি নানা রকম ভাবে বানাই, যাতে একটা মিউজিককে যতটা ৩৬০ ডিগ্রি এক্সপ্লর করা যায়। সুতরাং আমার ওরকম কোনও জনরা নেই যে আমি ওই জঁরার লোককে দিয়েই গাওয়াব। আমার একটা গান আছে যেটায় র‍্যাপ ইউজ করেছি, র‍্যাপের মধ্যে একটা অন্য মজা আছে, যারা সেটা শুনতে ভালবাসে তাদের কাছে সেটা একসেপ্টেড।

প্রঃ নতুন প্রতিভা যাদের এখন দেখা যাচ্ছে তারা অনেকেই আপনার ছাত্রছাত্রী। নতুন দের নিয়ে কী বলবেন?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ আমাদের একটা একাডেমি আছে। 'মিউজিক মাইন্ডস একাডেমি'। প্রায় ২৪ বছর পেরিয়ে গেল। আমার স্ত্রী অনিতা চট্টোপাধ্যায় এবং আমাদের অনেক সিনিয়র ছাত্রছাত্রী, ট্রেইন্ড ফ্যাকাল্টিরা আছেন। আমার একটা সিলেবাস তৈরি আছে। সেই সিলেবাসটাকে ফলো করে। সেখানে শুধু ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক হয় এমনটা নয়, ক্লাসিক্যাল রাগ রাগিনী শেখানো হয়, আধুনিক গান কীভাবে গাইতে হয়, তার যে নিজস্বতা সেটাও শেখানো হয়, পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুল গীতি, সব ধরনের মিউজিক সেখানে চৰ্চা হয়। ইনস্ট্রুমেন্ট কী করে ব্যবহার করতে হয়, তার সঙ্গে কী করে গাইতে হয়, মাইক্রোফোন কী করে ব্যবহার করতে হয়, টেকনোলজি, সারেগামার বাইরেও অনেকগুলো জিনিস আছে যেগুলো একজন পারফর্মার হতে গেলে শেখা দরকার সেগুলোও আমরা ট্রেন করি।

এবার সেখানে কেউ কেউ সেখানে নিজের মতো করে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে যাচ্ছে, যাচ্ছে না, আমার এ ব্যাপারে কোনও আপত্তিও নেই আবার আমি যে ওটাতে খুব বেশি ওদের উৎসাহ দিই এমনটাও নয়। এটা প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমি বেসিক জায়গাটা এমনভাবে তৈরি করার চেষ্টা করি যে আমার একাডেমি থেকে বেরবার পর সে পৃথিবীর যেখানেই গান করুক না কেন আমাদের গুরুদের কাছে আমরা যা শিখেছি সেই শিক্ষার এমন এমন কিছু জিনিস ওদের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করি যেখানে ওরা যেখানেই গান করতে যাক তার বেসিক ফান্ডাটা এত ভাল থাকবে যে সে যে কোনও আর্টিস্ট, সিঙ্গার, মিউজিশিয়ানের সঙ্গে  খুব সহজে পারফর্ম করতে পারবে। এটাই আমার উদ্দেশ্য থাকে।

প্রঃ রাঘবদা, শুধু পছন্দের গায়ক নয় খাদ্যরসিকও বটে, তো খাওয়া দাওয়া নিয়ে মজার অভিজ্ঞতা কিছু হয়েছে?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ আমি খুব খেতে ভালবাসি ছোট থেকেই, খাওয়াতেও ভালবাসি। সারাগামাপাধানিসা নিয়ে সারাজীবন থাকতে ভালবাসি। কিন্তু তার সঙ্গে খাওয়া দাওয়াটা আমার ইম্পরট্যান্ট। দেশ বিদেশ ঘোরাটা আমার খুব পছন্দের।

প্রঃআপনি রান্না করেন?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ আমি কমই করি, আমার মেয়েরা পুরোপুরি গানবাজনা করে, পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে মিউজিক পুরোপুরি মানে ফুল টাইম থাকাটা ওদের শখ। ক্লাসিক্যাল মিউজিক, ওয়েস্টার্ন মিউজিক দুজনে শেখে। নিজেরা গান কম্পোজ করে। আনন্দী-আহেরি অনেকেই তাদের চিনে গেছে। তারা আমারই দুই কন্যা। ওরাও খেতে ভীষণ ভালবাসে। ওরা খুব ভাল রান্না করে। চাইনিজ থেকে কন্টিনেন্টাল, ইন্ডিয়ান সব। বিদেশে যখন অনুষ্ঠান করতে যাই তখন স্ট্রিট ফুড থেকে শুরু করে স্পেশাল রেঁস্তোরা সব জায়গাতে ঘুরে বেড়াই।

প্রঃ এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে কখনও বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে খাবার নিয়ে?

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ মালয়েশিয়াতে একবার উদ্ভট একটা নাম দেখে ভেবেছিলাম ভাল কিছু হবে তারপর দেখলাম সেটা ওই শুয়োপোকা বা ঝিঁঝি পোকা টাইপের কিছু একটা জিনিস। তবে অদ্ভুত জিনিস খেয়েছি। আমি খরগোশের মাংস, ব্যাঙ, স্নেক স্যুপ খেয়েছি।

প্রঃ আপনার পছন্দের লিস্টে কোন কোন গায়ক গায়িকা আছেন

রাঘব চট্টোপাধ্যায়ঃ অগণিত। পুরনো সময় বললে লতা মঙ্গেসকর, আশা  ভোঁসলে আর দশটা লোকের মতোই আমিও তাঁদের একনিষ্ঠ ভক্ত। যাদের গান শুনে গান শিখেছি, গান ভালবাসতে শিখিয়েছেন যাঁরা। মহম্মদ রফি, মান্না দে, কিশোরকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, পরবর্তী সময়ের সোনু নিগম আমার ভীষণ প্ৰিয়, শ্রেয়া। শ্রেয়া তো আমার কলিগ। ওর সঙ্গে অনেক গানও করেছি। জুবিন নাটোয়াল ভাল গায়। অরিজিৎ তো অবশ্যই। এরা তো খুবই গুণী শিল্পী। কুনাল গাঞ্জাওয়ালা। এরকম অনেকেই আছে। সাউথ ইন্ডিয়ান মিউজিশিয়ানরাও আমার খুব পছন্দের সেগুলোও শুনি। সেইভাবে বলতে গেলে লম্বা লিস্ট। বিদেশে ডার্তি লুপস বলে একটা ব্যান্ড আছে। একান। এএনরিকে ইগলেসিয়াস। লাটিনো। বনিএম, অ্যাবা, রোলিং স্টোন, এরিক ক্ল্যাপটন। ইন্ডিয়ান মিউজিকের মধ্যে বিলায়েত খাঁ সাহেব, বড়ে গুলাম আলী খাঁ, আমির খাঁ সাহেব, জাকিরজী, সবারই আমি শুনেছি এবং এখনও শুনি। অনেককেই সামনে থেকে শোনার সুযোগ পেয়েছি।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...