প্রতি আশ্বিনে আদ্যা শক্তি মহামায়ার দুর্গা রূপের পুজোয় মেতে ওঠে মানুষ। বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত চলে মাতৃশক্তির আরাধনা।
জগগজননী পরমাশক্তি নামভেদে ও রূপভেদে বহু পরিচয়ে ব্যাপ্ত। ব্যাসদেব রাজা জন্মেজয়কে মহামায়ার স্বরূপ বিবৃত করতে গিয়ে বলেছেন,-"একই নট যেমন লোকরঞ্জন নিমিত্ত বেশ পরিবর্তন করে রঙ্গমঞ্চে বিভিন্ন ভূমিকা অভিনয় করে থাকে, সেইরূপ এই অদ্বিতীয়া ভগবতী চণ্ডিকা দেবতাদের কার্য সম্পাদনের জন্য স্বলীলায় বহুমূর্তি ধারণ করেন।"
দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার বহুবিধ ও বিচিত্র বরণা দিব্যমূর্তির মধ্যে দশমহাবিদ্যা রূপে দশবিধ মূর্তিতে প্রকাশিতা। অর্গলা স্তোত্রে মহাশক্তির দশটি রূপের আরাধনার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এইসব দেবী মূর্তি দশরূপে দশদিকে ব্যাপ্ত হয়ে চতুবর্গ ফল প্রদান করেন। মহাবিদ্যার এই নয়টি রূপ সমষ্টিগতভাবে নবদুর্গা নামে বিশেষ প্রসিদ্ধ।
চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ে ব্রহ্মাণ্যাদি অষ্টশক্তির কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। দুর্গাপূজার মহাষ্টমী তিথিতে এইসব দেবীর আহবান করে যথাবিহিত উপচার প্রদানের পর চতুঃষষ্ঠী যোগিনীর পূজা করতে হয়।

চিন্ময়ী দুর্গার নানা মূর্তির ভিতরই এই যোগিনীদের আত্মপ্রকাশ। দুর্গাঘটের নিম্নে যে অষ্টদল পদ্ম অঙ্কিত হয় তার প্রতি দলে আটটি করে মোট চৌষট্টি যোগিনী পূজার বিধান আছে।
কালিকা পুরাণে চৌষট্টি যোগিনীর নাম পাওয়া যায়। প্রথম রূপের নাম ব্রহ্মাণী, তারপর যথাক্রমে চণ্ডিকা, রৌদ্রী, গৌরী, ইন্দ্রাণী, কৌমারী, ভৈরবী, দুর্গা, নারসিংহী, কালিকা, চামুণ্ডা, শিবদূতী, বারাহী, কৌশিকী, মাহেশ্বরী, শঙ্করী, জয়ন্তী, সর্বমঙ্গলা, কালী, করালিনী, মেধা, শিবা, শাকস্তুরী, ভীমা, শাস্তা, ভ্রামরী, রুদ্রাণী, অম্বিকা, ক্ষমা, ধাত্রী, স্বাহা, স্বধা, অপর্ণা, মহোদরী, ঘোররুপা, মহাকালী, ভদ্রকালী, কপালিনী, ক্ষেমঙ্করী, উগ্রচণ্ডা, চন্ডা, চণ্ডনায়িকা, চামুণ্ডা, চণ্ডবতী, চণ্ডী, মহামোহ, প্রিয়ঙ্করী, বলবিকরিণী, বলপ্রমথিনী, মদনান্মোথিনী, সর্বভূতদমনী, উমা, তারা, মহানিদ্রা, বিজয়া, জয়া, শৈলপুত্রী, চণ্ডিকা, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী।
দেবী ভাগবতে আছে, দক্ষ যজ্ঞে শিবপ্রাণা সতী দেবীর দেহত্যাগের পর আশ্বিনের শুক্লাষ্টমীতে জগন্মাতা কোটিযোগিনী বৃন্দের দ্বারা পরিবৃতা ষোড়শ প্রলয়ঙ্করী ভদ্রকালী রূপে আবির্ভূতা হয়ে দক্ষযজ্ঞ বিনাশ করেন। তাই জগদম্বিকা দক্ষযজ্ঞবিনাশিনী রূপেও বন্দিতা। আজও শারদীয়া মহা পূজা প্রাঙ্গণে ধ্বনিত হয় —" ওঁ দক্ষযজ্ঞ বিনাশিনীমহাঘারোয়ে-যোগিনীকোটি-পরিবৃতায়ে ভদ্রকাল্যৈ হ্রীং ওঁ দুর্গায়ৈ নমঃ।"
ভুবনেশ্বর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে হীরাপুরে আছে চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। নবম শতাব্দীতে নির্মিত হয় এই মন্দির। দ্বিভুজা, চতুর্ভুজা ও দশভুজারূপে যোগিনীদের অধিষ্ঠান। শক্তিরূপা দশভুজা মূর্তি মহামায়া মূল আরাধ্যা। দেবী কাত্যায়নীর নয়টি মূর্তি আছে এই মন্দিরে।
In English

