মোহিত চট্টোপাধ্যায় এক অনন্য নাট্যকার। তাঁর নাটক অন্য নাটকের থেকে পৃথক। তাঁর নাটক গুলি শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুবকদের জীবনের নানা টানাপোড়েন নিয়ে। ১৯৯০ এর অর্থনৈতিক - সামাজিক -রাজনৈতিক অবস্থার প্রতি খুব সচেতন ছিলেন তিনি। সামাজিক পরিস্থিতিকে নিজের নাটকে ব্যবহার করেছেন তাই সমাজের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁর নাটকেরও পরিবর্তন হয়। বোঝাই যায় সমাজ তাঁর জীবনকে ও তাঁর লেখাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। তিনি চেয়েছিলেন যুব সমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগাতে, চেয়েছিলেন সমাজের বিভিন্ন পরিস্থিতির ব্যাপারে আমাদের সাবধান করতে। তাঁর মতামতকে নাটকের রঙে মিশিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করেছিল কিছু অসাধারণ নাটক যা আজ মঞ্চের আলোতে স্পষ্ট।
আমাদের প্রিয় মানুষটি আজকের দিনে আমাদের থেকে দূরে চলে গিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু রেখে গিয়েছেন প্রচুর সৃষ্টি, রেখে গিয়েছেন এমন বেশ কিছু নাটক যা আজ আমরা মঞ্চস্থ করি, বাকরহিত চোখে তাকিয়ে থেকে হাততালিতে ফেটে পড়া উপভোগ করি।
তিনি নাট্যজগতে একটা নতুন চিন্তা এনে দিয়েছিলেন। অনেক বিষয়কেই উনি এমন ভাবে ভেবেছিলেন যা অন্য কেউ এমনভাবে ভাবেই নি। তিনি এবসার্ড ফর্মের সাথে দর্শন মিশিয়ে এক অনন্য কাজ সৃষ্টি করেন। অস্থিরভাবে চেষ্টা করে গেছেন ইতিবাচক চিন্তা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করানোর। সমস্ত বিধিনিষেধ ভেঙে ফেলে তাঁর নাটক। তাঁর কাজ মানুষকে প্রেরণা জাগায় ও জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়।
চট্টোপাধ্যায়ের নাটকগুলি বেশিরভাগই বিশেষ করে চন্দ্রলোকে অগ্নিকান্ড, রাজরক্ত এবং ক্ষমতা ও নৈতিকতা নিয়ে কথা বলেছে। 'লাঠি' নাটক লেখার পরে তাঁর কাজ এক নতুন স্তরে পৌঁছয়। তাঁর লেখার ভাষার পরিবর্তন হয়, সচরাচর যে চরিত্র তাঁর নাটকে দেখা যায়, সেই গন্ডি ভেঙে তাঁর চরিত্রগুলি হয়ে ওঠে আরও সাধারণ। মানুষের জীবনের সমস্যা ও সাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরী হয় তাঁর কাহিনী। সাধারণ মানুষদের কে নিয়ে লেখার কারণ ছিল একটাই, তিনি তাঁদের জীবনে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের বোঝাতে চেয়েছিলেন জীবনের মূল্য। তাঁদের বুকের পাঁজরে ঢোকাতে চেয়েছিলেন সাহস আর আত্মবিশ্বাস।
মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক, তাঁর লেখা, তাঁর ভাবনা আর প্ৰতিভা চিরকালই আমাদের শিহরিত করবে। জাগাবে সাহস। যুব সমাজকে অনুপ্রাণিত করে যাবে যুগ যুগ ধরে। এক যুগ কেটে গেলেও ভোলা যাবে না তাঁর লেখার স্বর, তাঁর লেখার আওয়াজ। তাঁর মৃত্যুদিনে যেন না আসুক দুঃখ, আসুক মনে তাঁর লেখার চিন্তা আর ভাবনা।
In English

