কালী কথা: উলুবেড়িয়ার শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি, নিজেই দর্শন দিয়ে মূর্তির আদল ঠিক করেছিলেন মা

কালী যেমন করালবদনা, তেমনই তিনি বরাভয়দাত্রী, আবার তিনিই আনন্দময়ী। বাংলা জুড়ে অসংখ্য জায়গায় কালী বিরাজ করছেন আনন্দদায়ীনি আনন্দময়ী রূপে। সিঙ্গুর থেকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি, নিমতলা মহাশশ্মান থেকে হাওড়া আনন্দময়ী কালিকা গোটা বঙ্গেই বিরাজ করছেন।

হাওড়ার উলুবেরিয়ায় শতাব্দী প্রাচীন বিখ্যাত কালী মন্দির হল আনন্দময়ী কালী। গঙ্গা তীরে ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১৭ই বৈশাখ শুক্লা ত্রয়দশী তিথিতে আনন্দময়ী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মন্দিরের বয়স ১০৩ বছর, তৎকালীন মহকুমা শাসক যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শরৎচন্দ্র ধাড়ার  উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল মন্দির। দেবী কালিকার বিগ্রহের পদতলে শ্বেতপাথরের তৈরি সব আসনে শায়িত থাকেন দেবাদিদেব মহাদেব। এই মন্দিরে দেবী কালিকা তিনটি রূপে পূজিত হন, সাত্ত্বিক, রাজশ্রী ও তামসিক। প্রতিদিন দেবীর ভোগ নিবেদন করা হয়, ভোগে নিরামিষের আধিক্য সর্বাধিক। প্রতিদিন মায়ের ভোগে থাকে ভাত, ডাল, তরকারি, পরমান্নসহ বিভিন্ন পদ।

দেবী কালিকা এখানে তন্ত্র মতে এবং বৈদিক রীতিতে, অর্থাৎ দুটি মতেই পূজিত হন। দেশের নানান প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত মায়ের মন্দিরে এসে হাজির হন, মন্দিরে জাত ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই, সব ধর্মের মানুষ আসেন। সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের সাক্ষী দেবী কালিকা। দেবী কালিকার প্রতি বিশ্বাসের টানেই সারা বছর মন্দিরে ভক্তের ভিড় লেগে থাকে, উলুবেড়িয়ার শতবর্ষ প্রাচীন শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। নদীতে স্নান সেরে আনন্দময়ীর পুজো দেন ভক্তরা। বছরের বিভিন্ন সময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা ভক্তের ভিড় থাকলেও, কালীপুজোর রাতে উলুবেড়িয়ার শ্রীশ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়িতে ভক্তদের ঢল নামে। বছরের এই বিশেষ তিথিতে স্বর্ণালঙ্কারে সেজে ওঠেন মা। কালীপুজোর দিন সারারাত মন্দির খোলা থাকে। আলোয় সেজে ওঠে গোটা মন্দির।

আনন্দময়ী মায়ের মন্দির ও মূর্তি তৈরি নিয়ে নানান গল্প, জনশ্রুতি রয়েছে। শোনা যায়, সেই সময়ের ম্যাজিস্ট্রেট যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মায়ের স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আন্দুলরাজ শৈলেন্দ্রনাথ মিত্র মন্দির নির্মাণের জন্য জমি দান করেন। শোনা যায়, কাটোয়ার গোকুল ভাস্কর পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল রামবাগ গ্রামে কষ্টি পাথরের মূর্তি নির্মাণ করার সময়ে তাঁর চোখে পাথরের কুঁচো পড়ে গেলে মূর্তি নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি এক বালিকার কণ্ঠস্বর শোনেন। মেয়েটি বলেন, ‘তোমার চোখে কিছু হয়নি’। বালিকার মুখে এই আশ্বাসবাণী শোনার পর চোখ খুলেই, গোকুল ভাস্কর যাঁকে দেখেছিলেন, সেই রূপেই তিনি উলুবেড়িয়া কালীবাড়ির দেবীর রূপ দান করেন। বাংলার ১৩২৭ সনের ১৭ বৈশাখ শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে উলুবেড়িয়া কালীবাড়ির মা হয়ে ওঠেন সকলের মা আনন্দময়ী। এরপর থেকেই মায়ের অলৌকিক মহিমার কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। কালীপুজোর রাতে মায়ের রূপ দেখে মনে হয়, মা যেন ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করছেন

প্রতি গ্রীষ্মে ভরা বৈশাখের গরমে উলুবেড়িয়ার কালী বাড়ির মা শ্রী শ্রী আনন্দময়ীর প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়। মা যেমন শান্তি দায়িনী আবার তিনিই আনন্দদায়িনী। উলুবেড়িয়ার শতাব্দী প্রাচীন আনন্দময়ী কালীবাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে রাস উৎসব পালিত হয়। প্রায় ৭১ বছর যাবৎ মন্দিরে রাস উৎসব পালিত হচ্ছে। শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরের রাস উৎসব দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস উৎসব ছাড়াও মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায় পুজো হয়, ১লা বৈশাখে বিশেষ পুজো, দুর্গা পুজো, রান্না পুজো, ঝুলন যাত্রা ইত্যাদি পালিত হয়।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...