মহালয়ায় তর্পণ করা হয় কেন?

তারিণীবাবু আমাদের স্যার ছিলেন। প্রিয় স্যার। ভুত-ভগবান-নকুলদানায় তাঁর যে তেমন বিশ্বাস নেই, এটা তাঁর কথা শুনে আরামসে বোঝা যেত। ক্লাসে একটা গল্প তিনি প্রায়ই বলতেন। যদিও গল্পটা আমরা প্রায় সবাই জানি। তবু বলি:

ছোট্ট নানক একদিন নদীতে স্নান করতে গেলেন।গিয়ে দেখলেন যে, কয়েকজন লোক মন্ত্র পড়তে পড়তে আঁজলা ভরে জল নিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছে জলেই।  তাই দেখে নানক তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা এসব কী করছ গো?' তারা বলল, 'আমরা আমাদের স্বর্গত তিন পুরুষকে জল পান করাচ্ছি।'  তখন নানক তাদের পাশে বসে তাদের মতো করেই মন্ত্র বলে আঁজলায় জল নিয়ে অঞ্জলি দিতে লাগলেন। তাই দেখে একজন হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, 'তুই আবার কাকে জল দিচ্ছিস রে?' নানক বললেন,  'আমার ক্ষেতের গাছে।' লোকটা বলল, 'দূর বোকা এভাবে কি ক্ষেতে জল দেওয়া যায় নাকি?' নানক এবার মুচকি হেসে বললেন, 'কেন যাবে না? কোথায় কোন স্বর্গে থাকা তোমাদের মরে যাওয়া তিন পুরুষকে যদি এভাবে জল দিতে পার, তাহলে এই নদীর কাছে  ক্ষেতের জ্যান্ত গাছে জল দেওয়া যাবে না কেন?'  

এমনতর যুক্তিতে তর্পণকারীরা তো বেমালুম ভেবলে গেল! বুঝতে পারল তাদের ভুলটা কোথায়। আসলে মিথ্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। অথচ, প্রশ্ন করলেই যুক্তি এসে দরজা খুলে দেয়। গল্পটা এরকম পাদটিকাসমেত শুনে আমরা বেশ মজা পেতাম। তবে প্রতিবারই আমাদের মনে হত যে, আমাদের চেয়েও বেশি মজা পাচ্ছেন তারিণীবাবু, গল্পটা বলে।

অথচ সেই তারিণীবাবুই একদিন সমূলে আমাদের চমকে দিলেন। যুক্তিবুদ্ধি চুলোয় গেল। আমরা ভেবলে গিয়ে ভাবলাম, এ কী স্ববিরোধীতা রে বাবা! যে লোক যুক্তির কথা বলেন, সেই তিনিই কিনা মহালয়ার সকালে যুক্তকচ্ছ হয়ে কোশাকুশি নিয়ে নদীতে গিয়ে তর্পণ করছেন! চোখ কচলালাম, তাতেও দৃশ্যান্তর হল না। চরম তিতিক্ষায় সবেগে প্রশ্ন করলাম, 'এটা কীরকম হল স্যার?'

স্যার আমাদের দেখেও চমকালেন না। শুধু স্বভাবসিদ্ধ হাসিটি ঠোঁটের কোনায় রেখে আস্তে করে বললেন,  'এইরকমই হয় রে, কোথাও কিছু নেই, তবু কিছু মায়া থেকে যায় জানিস! এ হচ্ছে দেখার ব্যাপার, তোর অন্তর যা দেখবে, চোখে তুই তাই দেখবি। এই দেখ না, স্বর্গ কোথায় আমরা সত্যিই কি জানি? জানি না।  এতদিনেও পুরাণের গল্প ছাড়া মাটির নীচে জল, আকরিক, গ্যাস ছাড়া মর্ত্যলোকের মতো কোন বাসযোগ্য পাতাললোক তো আমরা খুঁজে পাইনি। কল্পিত দানবদের দেখাও মাইলের পর মাইল মাটি খুঁড়ে পাইনি। তা সত্বেও মিথ হারায়নি।  হারায়নি আমাদের স্বর্গত পূর্বপুরুষদের সঙ্গে স্বর্গে গিয়ে মিলনের আকাঙ্ক্ষা। শেষ হয় না মৃত্যুর পরও তাঁদের মুক্তির চিন্তা। কবি লিখেছিলেন যে, 'তোমার মহাবিশ্বতলে হারায় নাকো কিছু'--এটা যেন আমাদের সনাতন আত্মার কথা,  আদিম দর্শন।  তাই আমাদের পূর্বপুরুষ পিতৃপুরুষেরা মরেও মরেন না, বেঁচে থাকেন আমাদের আদিম চেতনায়। তাঁদের আহার-তেষ্টার কথাও আমাদের ভাবায়। তাই মৃত্যুর পর পিণ্ড দিই, নিয়ম করে বছরে একবার তাঁদের পিপাসা মেটাই, সেজন্যই মহালয়ার পিতৃপক্ষে তর্পণ করি। সোজা কথায়, মহালয়ার দিন অন্যকোন লোকে তাঁদের বেঁচে থাকাটা আমরা উদযাপন করি, তাঁদের স্মরণ করি।'

'এবার বাপ একটা প্রশ্ন ওঠা উচিত : এই যে স্মরণ, এটা ধর্মীয়রীতির বাইরে নিতান্তই ঘরোয়া ভাবে কি স্মরণসভার মতো করে করা যেত না? যেত না কেন, নিশ্চয়ই যেত। তবে তা ধোপে টিকত না। কিছুদিন পর তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেত। যেভাবে স্মৃতিসভার অনুষ্ঠান মৃত্যুর একবছর পর হামেশাই আর গা করে না আয়োজন করতে, তেমন করেই বন্ধ হয়ে যেত। মহালয়ার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস আর আবেগের মোড়কে যেহেতু পুণ্য-মোক্ষ-আত্মশুদ্ধির প্রবাদ জড়িয়ে আছে, তাই বয়ে চলেছে।'

'আসলে আচার আমাদের মজ্জায় মিশে রে বাপ, সেও তো অন্তরে বসে, সেও অনেক কিছু বিশ্বাস করায়, অনেক কিছু দেখায়, অনেক কিছু শেখায়, তার ইচ্ছেয় আমাদের চালায়। আর আমি যে তর্পণ করছি, তাই দেখে অবাক হচ্ছিস তো? তবে শোন, আমার বাবা-মা খুব চাইত মহালয়ায় ছেলে জল দেবে মুখে। মরার সময় মুখ ফুটে বলেও গেছে সে কথা। তাঁদের সেই সামান্য ইচ্ছেটুকু পূর্ণ করা কি ছেলে হিসেবে আমার কর্তব্য নয়, বল?

আমরা কিছু বলি না। শুধু চুপ করে তর্পণব্যস্ত নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকি। যেখানে দর্শন আর কর্তব্য মিলেমিশে কোথাও যেন এক হয়ে যায়, সেখানে আর কী-ই বা বলার থাকে!

You can share this post!

...

Loading...