স্ট্রেট ড্রাইভের মাস্টার গাভাস্কার

সানির ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবেন। ছোটবেলার ইচ্ছে। কিন্তু, ছোটবেলার ইচ্ছে ক'জনের জীবনেই বা আর পূর্ণতার পথ খুঁজে পায়! তার ইচ্ছের পাতা বড় হওয়ার দিনগুলোতে ঝরতে ঝরতে অন্য ইচ্ছেপাতার আবির্ভাব হয়। সানি অর্থাৎ সুনীল গাভাস্কারেরও তাই হয়েছিল। তবে, বাল্যবেলার ইচ্ছেটা নিয়ে পরজীবনে তাঁর কোন আক্ষেপ ছিল না। আসলে, এই ইচ্ছে বদলের ইতিহাস শুধুই প্রাকৃতিক নিয়ম নয় তাঁর জীবনে, বরং এর জন্য প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে নিশ্চিত দায়ী ছিল বাবা মনোহর গাভাস্কারের ইন্ধন আর মামা মাধব মন্ত্রী-র প্রশ্রয়। বাবা কলেজ ও অফিস ক্লাবের নিয়মিত ক্রিকেটার ছিলেন; আর মামা ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটার। ফলে, ভাগ্নে মাতৃকুল ও পিতৃকুল--দুই কুলের টানেই পাল তুলে দিয়েছিলেন।

 

বাবা প্র্যাকটিস বা ম্যাচ থেকে ফিরে তাঁর প্রিয় ব্যাটটির কী যত্নআত্তিই না করতেন--যেন ছেলেমানুষ ঈশ্বরসেবা করছেন! ছোট্ট সুনীল বাবার সেই ছেলেমানুষিকে নিজের ছেলেমানুষির সঙ্গে এক করে ফেললেন। মনে করলেন, বাবাও যে তাঁর মতো খেলছেন! ধীরে ধীরে বাবার খেলাটাও তিনি ভালোবেসে ফেললেন। তাঁর নিজের খেলা করে ফেললেন। ব্যাটবলকে সঙ্গী করে নিলেন। সে এমন সঙ্গী হল যে, ঘুমোনোর সময়ও তারা তাঁর শয্যা ছাড়ার সুযোগ পেল না।  বাবা বুঝলেন, তাঁর আত্মার ধন ছেলের আত্মার সঙ্গেও এক হয়ে গেছে! তিনি খুশি হলেন। কোথাও বড় বড় ক্লাবের খেলা হলেই বাবা ছেলেকে সঙ্গে করে খেলা দেখাতে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। সুনীলের তখন বয়স সবে বছর ছয়। এই বয়সে ছেলেও বলিহারি--যতক্ষণই খেলা চলুক না কেন, তার ক্লান্তি নেই, ধৈর্য্যের অভাব নেই, উৎসাহের ঘাটতি নেই, খেলা শেষ না-করে উঠবার জো নেই! এই খেলা দেখা নিয়েই একদিন ঘটে গেল একটা ঘটনা।

 

বছর কয়েক পরের কথা। সুনীল তখন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ছাত্র। এ-সময় বম্বের ব্রাবর্ণ স্টেডিয়ামে ভারতের সঙ্গে টেস্ট খেলতে এল অস্ট্রেলিয়া। ফলাও করে সে-কথা কাগজে-কাগজে লোকের মুখে-মুখে ঘুরতে লাগল গোটা বম্বে জুড়ে। সুনীলের কানেও উঠল। ব্যস, বন্ধু বাবাকে বললেন যে, এ-ম্যাচ দেখতেই হবে, টিকিট চাই। বাধ্য বাবা অমনি ছেলের জন্য টিকিট জোগাড় করে দিলেন টুক করে; তিনি খেলোয়াড় মানুষ, খেলার জগতের কত লোকের সঙ্গে তাঁর আলাপ, একটা টিকিট জোগাড় করা আর এমন কী ব্যাপার! খেলা দেখতে গেলেন সুনীল। স্কুলের পারমিশন না-নিয়েই স্কুল অফ করলেন। বুঝলেন, কপালে শাস্তির খাঁড়া নাচছে! না, এখানেও বাবা স্বতঃপ্রণোদিত ত্রাতা হয়ে উদয় হলেন। ছেলে যেদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরোলেন, বাবা তাঁর হাতে একখানা চিঠি ধরিয়ে দিলেন। তাতে লেখা--'হেডেক--কজ অব অ্যাবসেন্স'!

 

প্রিন্সিপাল চিঠিখানা হাতে নিলেন। পড়লেন। তারপর স্থির চোখে খানিক সুনীলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর দুম করে জিজ্ঞেস করলেন, 'হুম, ম্যাচ কেমন দেখলে সুনীল?' ম্যাচ দেখে মহা-আপ্লুত সুনীল সাতপাঁচ কিছু না ভেবেই বলে বসলেন, 'দারুণ!' এবং এখানেই থামলেন না, উৎসাহের চোটে গড়গড় করে বলে গেলেন খেলার আগাপাশতলা বিবরণ। আর তারপরই হঠাৎ করে বোধহয় বিপদটা খেয়াল হল--সুতরাং, দুম করে থেমে গেলেন। কিন্তু,  তখন আর থামলেই কী, আর না-থামলেই বা কী--যা বলার নয়, তাতো বলা হয়েই গেছে ততক্ষণে! সত্যটা বলার জন্য তিনি অবশ্য মুক্তি পেলেন। কিন্তু, বাবা পেলেন না। তাঁকে কল করিয়ে বেশ করে দু'কথা শোনানো হল, এবং ছেলেকে যে তিনি নিজের হাতে গোল্লায় পাঠাবার ব্যবস্থা করছেন, এটা বেশ করে বুঝিয়ে দেওয়া হল! এবং, শেষমেশ লজ্জার মাথা খেয়ে ভুল স্বীকার করে তবেই মনোহর মুক্তি পেলেন; সেইসঙ্গে প্রিন্সিপালের মুখে ছেলের সততার প্রশংসা শুনে বাবা হিসেবে টুকুনি শান্তিও পেলেন।

 

মামার বাড়ি গেলে খেলার রগড়টা কতটা গড়াত--সেটা এবার বলি : সেখানে মামার মাস্টারি ছিল দেখার মতো। ভাগ্নের পেছনে দেবার মতো সময় ও অধ্যাবসায় তাঁর যথেষ্টই ছিল। কাজেই, যতক্ষণ না একটা শট মনের মতো হত, ভাগ্নেকে মামা কিছুতেই ছাড়তেন না। চলত বেশ কয়েক ঘন্টার কসরৎ। মামার ইস্কুল ছুটি হলে সুনীল নেমে আসতেন ব্যাট বাগিয়ে পাড়ার রাস্তায়। মামার গ্যারেজ ঘরের সামনে। সেখানে তখন ক্রিকেট-উদগ্রীব পাড়ার ছেলেরা হাজির। তাদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে শুরু করতেন আর এক দফা খেলা। এ-সময় মামার গ্যারেজের দরজা হত উইকেট, রাস্তা খেলার মাঠ। ততদিনে সবাই জেনে ফেলেছিল একবার সুনীলের হাতে ব্যাট এলে দু'তিন ঘন্টা একেবারে নিশ্চিন্ত। তখন দরজা ছেড়ে পুরো দেওয়াল উইকেট করলেও তাঁকে আউট করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। আর সুনীলের পক্ষে সহজ ছিল বিপক্ষের বলে বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারিতে আশপাশের এবাড়ি-ওবাড়ির জানলার ঝন ঝন কাঁচ ভাঙা! তখন এ-বাড়ি ও-বাড়ির সে কী হাঁকডাক, কী হৈহল্লা! যেন কেলেঙ্কারির একশেষ। তবে, এসব গ্রাহ্য করলে কী আর চলে! হাত খুলে ব্যাট চালানোর মজাই যে আলাদা! অবশ্য সে মজায় মোক্ষম বাধা এল একদিন। সেও এক ঘটনা। একদিন ঘরের মধ্যেই বলে-ব্যাটে ঠুকঠাক করছিলেন সুনীল। কখন তাল হারিয়ে বেতাল হয়ে জোরসে চালিয়ে দিলেন ব্যাট। মা বাড়ির কাজ করছিলেন খানিক দূরে। ব্যাট চালাতেই বল বাঁই করে উড়ে গিয়ে লাগল সোজা তাঁর নাকে। ব্যস, রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই ব্যাপার হয়ে গেল। এবার তিনি তিনসত্যি করলেন--বাড়িতে বা রাস্তায় খেলার সময় ব্যাট তুলে বল কখনোই মারবেন না। মাটি কামড়ে বল যাতে সোজা ছুটে যায়, শুধু সেভাবেই খেলবেন। শুরু হল প্র্যাকটিস। শুরু হল স্ট্রেট ড্রাইভ খেলা। এভাবেই ধীরে ধীরে স্ট্রেট ড্রাইভ শটে মাস্টার হয়ে উঠলেন তিনি। এবং, কালক্রমে এটাই হয়ে গেল তাঁর বিশেষ, 'স্টাইল'।

 

ক্রীড়াছাত্র হিসেবে সুনীল ছিলেন খুবই বাধ্য। অসাধারণ ছিল তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। প্রথাগত কোচিং তিনি পাননি। বাবা, মামা এবং বরেণ্য খেলোয়াড়দের খেলা দেখে দেখেই তাঁর ক্রিকেট-শিক্ষা। অদ্ভুত ছিল তাঁর অধ্যাবসায়। তারও একটি গল্প আছে। একদিন তিনি খেলতে বেরুচ্ছেন, এমন সময় ভারতীয় টিমের কোচ কমল ভান্ডারকর তাঁদের বাড়িতে এলেন। নিজে থেকেই সুনীলের খেলার স্টাইল দেখতে চাইলেন। সুনীল দেখালেন। কমল তাঁকে সময়োপযোগী হওয়ার কিছু টিপস দিলেন। এবং, একাগ্রতা বাড়ানোর জন্য দেওয়ালে বলের ছবি এঁকে তার দিকে প্রতিদিন আধ ঘন্টা ধরে অপলক তাকিয়ে থাকার উপদেশ দিলেন। গাভাস্কার যতদিন খেলার জগতে ছিলেন ততদিন তিনি সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। গুরুপ্রতিম অগ্রজদের উপদেশে নিজেকে সব সময়ই সময়োপযোগী করে রাখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দিনের পর দিন। এই সরল অধ্যবসায়ের গুণেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সফলতার চাবিকাঠি, 'ফার্স্ট বলের সামনে ভারতীয়রা ভীত'--এই অপবাদ ঘুচিয়ে দিতে পেরেছিলেন, ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, বিশ্বের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে দশ হাজার রানের রেকর্ড করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছিলেন, তিরাসির বিশ্বকাপজয়ের অন্যতম যোদ্ধা হতে পেরেছিলেন।

 

 

 

You can share this post!

...

Loading...