গরমের ঝিমোনো দুপুর আর রিক্সার ক্যাঁচক্যাঁচ মনে করায় নব্বই-এর ছোটবেলা

জাপান থেকে একটা তিনচাকার বাহন এল। মানুষের হাতে টানা বাহন যে মানুষ বইতে পারে। প্রথমে তিনচাকার যান হিসেবেই রাস্তায় নেমেছিল যানটা। তারপর কালের বিবর্তনে দুই চাকাই হল তার পথ। তবে তিন চাকার বাহনটিও একেবারে উধাও হল না। এই বাহনের নাম রিক্সা। হাতে টানা বা প্যাডেলে পা দিয়ে চালানো রিক্সা। দুইই একটা অন্য জগতের পরিচয়বাহক ছিল সেই সময়। কোন সময়? নব্বই দশক। রিক্সার ক্যাঁচ ক্যাঁচ নব্বই দশকের অনেক অনুভূতির আধার ছিল।

তিন চাকার টোটোর আবির্ভাব হয়নি তখনও পর্যন্ত। দুপুরের নিস্তরঙ্গ সময়ে একটা রিক্সার আওয়াজ কত মন খারাপ সারিয়ে দিয়েছে। যে মানুষটা প্রতিদিন প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকে, তার সেই প্রিয়জনের রিকশা করে ফেরার কথা নব্বই দশকের ভালোবাসার ইঙ্গিতবাহী।

মফস্বল অঞ্চল গুলোতে তখনো পর্যন্ত টোটো নামক বাহনটির আবির্ভাব হয়নি। এমনকি ছোটখাটো অঞ্চলের মধ্যে বাস যাতায়াতও ছিল না। অনেকটা দূর পর্যন্ত যেতে হতো রিক্সা করে। যে সকল অ্যাপ ক্যাপগুলো আজকাল নিমেষে এদিক সেদিক চলে যায়, তাদেরও রাস্তার সঙ্গে চেনা পরিচিতি হয়নি। এমন সময়ে একমাত্র রিকশাই ছিল এমন এক মানুষ চালিত বাহন যা গ্রাম বা মফঃসলের ছোট ছোট অঞ্চলগুলোকে জুড়ে রাখত। একেবারে চকচকে হাইওয়ে বা সাদামাটা বাংলায় যাকে বড় রাস্তা বলে সেই সব রাস্তাগুলি ছাড়া বাসের মাধ্যমে যাতায়াতের উপায় থাকতো না। রিক্সাই ছিল একমাত্র সফর সঙ্গী।

এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় হাতে টানা রিক্সার কথা। নব্বই দশকের উত্তর এবং মধ্য কলকাতায় হাতেটানা রিক্সার চল ছিল। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলেও চলতো হাতে টানা রিকশা। হাতে ডানা রিক্সার শুরুও হয়েছিল জাপান থেকে, যদিও ঐতিহাসিকরা অনেকেই বলেন হাতে টানা রিকশা সবার আগে শুরু হয়েছিল মার্কিন মুলুকে। গঠনের দিক থেকে এমন ভাবেই তাদের তৈরি করা হয়েছিল যাতে তারা হয় হালকা ওজনের এবং চাকাগুলো মাটির সঙ্গে যেন একেবারে সহজে গড়িয়ে যেতে পারে।

রিক্সা শব্দটি আবির্ভূত হয় ‘জিন-রিকি-শা’ এই শব্দ থেকে। যার অর্থ তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমে জিন অর্থ মানুষ, তারপর রিকির অর্থ শক্তি, শা অর্থ যান। অর্থাৎ মানব চালিত যান। জাপানি এই রিক্সা আবিষ্কৃত হয় ১৮৬৯ সালে। রিকশার গতি তবে বেশ ভালো ছিল, জাপানে জন্ম নেওয়ার পরে কয়েক বছরের মধ্যেই চীন, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে রিক্সার আবির্ভাব হয় ইংরেজদের হাত ধরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আসার আগে পালকির চল ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে যাতায়াতের প্রয়োজন বাড়লো এবং তখন থেকে শুরু হয় পালকির রিলে পরিষেবা। ঐতিহাসিকদের মতে ১৮৯০ সালে চীন থেকে জাপানি রিক্সার কাঠের সংস্করণটি ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় প্রথম আমদানি করেন এক ইহুদি ব্যবসায়ী। ১৯৩৩ সালে মোট ছয়হাজারটি হাতে টানা রিকশাকে পাকাপাকিভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর থেকে বেশী রিক্সা দেখা গেলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এমনটাও বলা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেক রিকশাই সারা কলকাতা জুড়ে ঘুরে বেরিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়ার উপনিবেশকতাবাদ হ্রাস পাওয়ার কারণে হাতে টানা রিক্সা ব্রিটিশ উপনিবেশ গুলোতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতা শহরে তারপরেও রম রম করে চলত হাতে টানা রিক্সা। নব্বই দশকের অন্যতম বিশেষত্ব এই হাতেটানা রিকশার উপস্থিতি। ২০০৫ সালে এই ধরনের রিক্সা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়। তার ফলে নানা বিক্ষোভ, ধর্মঘট হয়। বর্তমান সময়ে হাতের টানা রিক্সার প্রচলন অনেকখানি কমে গেছে। তবে কিছু অঞ্চলে দুপুরের সময় বলতে আজও হাতে টানা রিক্সার ঘস ঘস আওয়াজকেই বোঝায়।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...