এমন বন্ধু আর কে আছে, তোমার মতো সৌরভ

সেও আর এক জুলাই মাস। দু'হাজার দুই সালের তেরই জুলাই। লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভারত। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনাল। ইংল্যান্ড ছুঁড়ে দিয়েছে তিনশো পঁচিশ রানের এক দুর্দান্ত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু, একশো ছেচল্লিশ রানের মাথায় পাঁচটি উইকেট পড়ে গেল। টিম ভারত তখন দারুণ টেনশনে অস্থির হয়ে উঠল। ক্যাপ্টেন সৌরভ গাঙ্গুলি যে বেশ চাপে রয়েছেন, তাঁকে আপাতভাবে শান্ত দেখালেও সেটা ধরা পড়ছে, কারণ, দাঁতে নখ কাটছেন। কেবল আশা জাগিয়ে এই রকম একটা চরম পরিস্থিতিতে ভারত টিমস্পিরিট বজায় রাখার চেষ্টা করল। মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। শুধু ঘুরেই দাঁড়াল না, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে শেষ অব্দি ম্যাচ জিতে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি হাসিল করে ছাড়ল। ভারতীয় শিবির অপার্থিব আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল, মনে পড়ল ভারতের মাটিতেই ভারতকে হারিয়ে ফ্লিনটপের জার্সি ওড়ানোর ক্ষত, মনে হল, তারও জবাব দিতে হবে আজ! অমনি লর্ডসের ব্যালকনিতে উচ্ছ্বসিত হরভজন সিং আবেগে ভেসে নিজের জার্সি খুলতে গেলেন, আর ঠিক তখনই রাহুলের এক খোঁচায় চমকে তাকালেন, দেখলেন--জয়ের আনন্দ আর ভারতীয়ত্বের স্পর্ধায় সৌরভ নিজের জার্সি খুলে উড়িয়ে ততক্ষণে বিপক্ষকে যোগ্য জবাব দিচ্ছেন।

তারপর এল গ্রেগ চ্যাপেল পর্ব। ভারতীয় ক্রিকেটের একটি কালো অধ্যায়। চ্যাপেলের অপছন্দের পাত্র সৌরভ নানান অভিযোগে বিদ্ধ হলেন। একে একে ওয়ান ডে ও টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়কত্ব তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হল। বার বার বড় বড় করে তুলে ধরা হতে লাগল ক্রিকেটার হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলি যে ফুরিয়ে গেছেন--সে কথা। প্রথমে তাঁকে জলের বোতলবাহক প্লেয়ার করা হল, তারপর ক্রমাগত বসিয়ে দেওয়া হল। ভারতীয় ক্রিকেট নড়বড়িয়ে চলতে লাগল, সৌরভকে বের করে দেওয়া হল ট্র্যাকের বাইরে। একজন ভালো খেলোয়াড়কে জন্মের মতো শেষ করে দেওয়ার জন্য এর থেকে ভালো উপায় আর বোধহয় কিছুই হতে পারে না! কিন্তু, বাংলার মাটিতে সৌরভ শেষ হয়ে যাবার জন্য জন্মাননি, হেরে যেতে শেখেননি। নিজের চেষ্টা, ধৈর্য্য, দীর্ঘ লড়াই, প্রতিভা আর যোগ্যতা দিয়েই আবার ভারতীয় দলে নিজের জায়গা করে রাজার মতো খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। এভাবেই  লর্ডসের সেই জার্সি ওড়ানো মানুষটা আবার যেন জার্সি ওড়ালেন।

ঘুরে দাঁড়িয়ে বা লড়াই করে সৌরভ যেমন নিজেকে বারে বারে প্রমাণ করেছেন, তেমনি অধিনায়ককালে অনেক সতীর্থকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও করে দিয়েছেন। হাত বাড়ালেই তাঁরা একজন বন্ধুকে সব সময় কাছে পেতেন, আর সেই বন্ধুর নাম কখনো 'সৌরভ', কখনো 'দাদা', কখনো 'মহারাজ'। উনিশো ছিয়ানব্বই সালের বিশে জুন, লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক টেস্ট ম্যাচে দু'জন  ভারতীয় ক্রিকেটারের অভিষেক হয়েছিল। সৌরভ গাঙ্গুলি ও রাহুল দ্রাবিড়। তার মধ্যে সৌরভ একশো রান করে যাঁরা ডেবিউ টেস্টে একশো রান করেছেন--তাঁদের মধ্যে নিজের জায়গা করে নিলেন। রাহুলও বেশ প্রশংসিত হলেন। কিন্তু, দু'হাজার সালে সৌরভ যখন টিম ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন হলেন, তখন খারাপ ফর্মের ফলে রাহুলের কেরিয়ার অনিশ্চয়তায় ডুবতে বসেছিল। সতীর্থকে কী এত সহজে ডুবতে দেওয়া যায়! এগিয়ে এলেন সৌরভ। এগিয়ে এস ডুবন্ত রাহুলকে বাঁচিয়ে উইকেট কিপার হিসেবে টিমে জায়গা পাকা করে দিলেন। শুধু রাহুল নন, যুবরাজ সিং, বীরেন্দ্র সেহবাগ, মোহাম্মদ ক্যাফ, হরভজন সিং-দের মতো খেলোয়াড়েরা কেউ ভারতীয় টিমে এন্ট্রি পেয়েছেন, কেউ বা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন ক্যাপ্টেন সৌরভের সহায়তায়। দু'হাজার সালে যখন হরভজন সিংহের অল্পদিনের কেরিয়ার নিয়মভঙ্গের অপরাধে জলাঞ্জলি গেল, নির্বাচকদের চক্ষুশূল হওয়ায় ফেরার পথও যখন বন্ধ হয়ে গেল; তখন বাবা মারা গেলেন, হতাশ হয়ে ভেঙে পড়লেন ভাজ্জি। কিন্তু, কাঁধের উপর একটা হাত পেলেন বন্ধুত্বের, সেই হাত সৌরভের। তারপর দু'হাজার এক সাল এল। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের এক টেস্ট সিরিজে অনিল কুম্বলে তাঁর আঘাতের জন্য খেলতে পারলেন না। এই সুযোগে নির্বাচকদের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সমস্ত বাধা অতিক্রম করে সৌরভ সমর্থ হলেন হরভজনকে দলে ফিরিয়ে আনতে। হরভজনও অবশ্য তাঁর সম্মান রক্ষা করলেন। দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ছিনিয়ে নিলেন টেস্ট উইকেটে হ্যাট্রিক করা 'প্রথম ভারতীয়'র খেতাব। ব্যস, আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি হরভজনকে। এভাবে অজস্র লড়াই আর ফিরে আসার সাফল্যে এবং অনেকের প্রেরণায় সুরভিত হয়ে আছেন সৌরভ--যিনি একইসঙ্গে বাংলার গর্ব, ভারতের গর্ব।

You can share this post!

...

Loading...