কালী কথা: ৫০০ বছরের প্রাচীন শ্যামবাজারের জয়কালী মন্দির

কালীর শহর কলকাতা, উত্তর থেকে দক্ষিণ এ শহরকে যেন বেঁধে রেখেছেন দেবী কালিকা। শ্যামবাজারে রয়েছে জয় কালীবাড়ি। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে ঘোড়সওয়ার নেতাজির মূর্তি ছেড়ে বেলগাছিয়ার দিকে কয়েক পা এগোলেই পড়বে দেবী জয়কালীর মন্দির। একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী মন্দিরের বয়স সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো বছর। 

 

একদা শ্যামবাজার ঘেঁষে বয়ে যেত পতিতপাবনী গঙ্গা। গঙ্গার তীরে ছিল মহাশ্মশান। সেখানেই মা কালীর আরাধনা হত খড়ের ছাউনির মন্দিরে। কুটির মাটির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে সাধনা করতেন জনৈক গিরিশ ব্রহ্মাচারী। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মায়ের মূর্তিটি মেদিনীপুরের ঘাটাল থেকে আনা হয়েছিল। গিরিশ ব্রহ্মচারীই এনেছিলেন মূর্তিটি। ধীরে ধীরে কলকাতা শহরে জনবসতি বাড়ে। শ্যামবাজারও জনবহুল হয়ে ওঠে। দেবীর মাহাত্ম্যও ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।

joykali

 

আর একটি মতে, আনুমানিক ২০০ বছরেরও বেশি আগে শ্যামবাজারের জয় কালীবাড়ির স্থানে ছিল এক সাধকের পর্ণ কুটির। কাছেই ছিল এক পিরবাবার থান। পূর্ববঙ্গের যশোরের বাসিন্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ব্রহ্মচারী, স্ত্রীর মৃত্যুর পর পুত্র গিরিশকে শোভাবাজার অঞ্চলে তাঁর শশুরববাড়িতে রেখে আসেন। তখন শ্যামবাজারের এক সাধকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। তিনি সাধকের অনুরোধে ওই মন্দিরে সেবক হিসাবে থেকে যান। লক্ষ্মীনারায়ণ ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গিরিশ ব্রহ্মচারী মন্দিরের পরবর্তী পালাদার নিযুক্ত হন। সেই সময় মন্দিরে মায়ের নিত্যপুজোর জন্য মেদিনীপুরের ভট্টাচার্য পরিবারকে পৌরহিত্যের কাজে নিযুক্ত করা হয়। আনুমানিক ১৯৭৮ সাল নাগাদ শ্যামবাজার রোড তৈরি হওয়ার সময় বর্তমান মন্দির পাকা করে দেওয়া হয়। 

 

এই মন্দির ঘিরে রয়েছে এক অদ্ভুত কাহিনি। কলকাতার জয়কালী মন্দিরে মাকে একবার মুরগির ডিম দিয়ে পুজো দেওয়া হয়েছিল। তাতেই দেবী তুষ্ট হয়েছিলেন। সাধারণত মন্দিরে বা পুজোর মুরগির ডিম নিবেদন করার রীতি নেই। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বেশ কিছু বছর আগে দুপুর বেলায় এক ডিম ব্যবসায়ী একটি মুরগির ডিম নিয়ে মায়ের কাছে আসেন, তিনি দেবীকে ওই ডিম ভোগ হিসাবে নিবেদন করতে চান। অনেকে বাধা দিলেও অনড় থাকেন ওই ব্যবসায়ী। ব্যবসার মঙ্গলের জন্য তিনি ডিম দিয়ে পুজো দিয়ে তবেই ফিরবেন। মন্দিরের বাইরে থেকে ডিম মা কালীকে নিবেদন করেন ব্যবসায়ী। 

 

মন্দির চাঁদনি স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। দেবী খুবই জাগ্রতা। দেবী মূর্তি কষ্টিপাথর নির্মিত। চতুর্ভুজা। তিনি বরাভয় ও অভয়দায়িনী। মায়ের পদতলে থাকেন মহাদেব। চোখ উজ্জ্বল, এক অদ্ভুত মায়া শক্তি জড়ানো তাঁর নয়ন। দেবীর জিহ্বা সোনার, সালংকারা। শ্যামবাজারের জয়কালী বাড়িতে মা কালীকেই দুর্গা, লক্ষ্মী, জগদ্ধাত্রী, অন্নপূর্ণা, সরস্বতী রূপে কল্পনা করে নির্দিষ্ট দিন পুজো করা হয়। নিত্যপুজো হয়। 

প্রত্যেকদিন দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। সেই আমিষ ভোগই প্রসাদ হিসাবে বিতরণ করা হয় ভক্তদের। এছাড়াও প্রতি মাসে অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পুজো ও অন্নভোগের আয়োজন করা হয়। দীপান্বিতা কালীপুজোয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে পুজো হয়। মানুষের বিশ্বাস, জয় কালী মায়ের কাছে যা মানত করা হোক না কেন, তিনি সব মনস্কামনা পূরণ করেন।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...