তাঁর কলমের যাদু-বাস্তবে সিনেমা হয়ে উঠেছে অন্য এক জগৎ

সাহিত্য মানে কল্পনা। সাহিত্য মানে আবার বাস্তবও। সাহিত্যের গভীর মনস্তত্ত্ব, জীবনীশক্তি বরাবর মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। কিন্তু যাঁর কলমের ডগায়‌ যাদু-বাস্তব এসে ধরা দেয়, যাঁর সাজানো সাদা কালো অক্ষরেরা মানুষের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে, তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক কোন বিশেষণে এই মানুষটির সাহিত্যকর্মকে বিশ্লেষণ করা যায়, তা নিয়ে বোধহয় ভাষাও ধন্দে পড়ে যায়। ১৮৯৯ সালের ৩০শে মার্চ বারাণসীতে জন্ম এই অসামান্য সাহিত্যিকের। তাঁর জীবন ও বাসস্থান তাঁর সাহিত্যের মতোই বৈচিত্র্যময়। উত্তর কলকাতার বরানগরের বাসিন্দা হলেও তারাভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজলীপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকতেন বিহারের পূর্ণিয়ায়। সেখানেই তাঁদের কোল আলো করে এই সাহিত্যিকের জন্ম। পরে তাঁরা কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯১৫ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করে তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন পরবর্তী শিক্ষালাভের জন্য। কুড়ি বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। 'যৌবনস্মৃতি'। ১৯১৯ সালে বি এ পরীক্ষায় পাশ করে আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে পাটনায় পাড়ি দেন। আইন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করলেও সাহিত্যানুরাগই তাঁকে প্রকৃত অর্থে অন্তরের সাধনার পথে নিয়ে যায়। তারপর! যথারীতি সাহিত্য ও তিনি হয়ে ওঠেন একে অপরের পরিপূরক। সাহিত্য চর্চা শুরু কুড়ির দশকে। প্রথম প্রকাশিত গল্প 'রক্তসন্ধ্যা' ১৯৩০ সালে। তারপর মুম্বাই পাড়ি দেন ১৯৩৮ সালে। সেখানে চিত্রনাট্য লিখতেন। তারপর চলচ্চিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আবার সাহিত্যচর্চা শুরু করেন পুনায়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। তিনি মনে করতেন তাঁর নিজের বৈচিত্র্যময় জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টিতে।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট চরিত্রেরা চলচ্চিত্রকে অন্য মাত্রায় উপনীত করেছিল। সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রেই নাটকের হাত ধরে অগণিত মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু চলচ্চিত্র প্রযুক্তিনির্ভর বলে খুব কম লেখকের সৃষ্টি চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী চলচ্চিত্রের উপাদানের পরিপূর্ণ। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি ইতিহাসের রঙে কল্পনার ছবি এঁকে পাঠককে অন্য জগতে পৌঁছে দেয়। 'ঝিন্দের বন্দী' সিনেমাটি তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়িত রূপ। তিনি নিজে তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি নিয়ে বলেছিলেন "আমার ঐতিহাসিক কাহিনীগুলো কল্পনাশ্রয়ী ইতিহাস নয়, বরং ইতিহাস-আশ্রিত কাল্পনিক কাহিনী"।

তাঁর সৃষ্ট ব্যোমকেশ, বরদা, সদাশিব যেন এক এক রঙে আঁকা ছবি। তিনি মনে করতেন কোন চরিত্র সৃষ্টির মূল উপাদান সেই চরিত্রের যথাযথ বর্ণনা যা তাকে জীবন্ত করে তোলে। তেমনি বর্ণনার সম্ভার ছিল তাঁর উপন্যাস বা ছোটগল্পের প্রত্যেকটি চরিত্র। যেমন তাঁর ব্যোমকেশে বক্সীকে নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গল্প 'পথের কাঁটা' -এ সমসাময়িক কলকাতার এক চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। ছোটখাটো বিবরণের মাধ্যমে। তেমনি বরদার অলৌকিক গল্প গুলিতে সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। ঐতিহাসিক কাহিনীগুলিতে সেই সময়কার প্রকৃতি,পরিবেশ, মানুষ, রাজপুরীর যথাযথ বর্ণনা দিয়েছেন। ফলে তাঁর সৃষ্টি পাঠককে পৌঁছে দিয়েছে সেই জগতে যেখানে বসে তিনি রচনা করেছেন কাহিনীগুলো। স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়ে উঠেছে অনেক সহজ। সাবলীল। এই অসামান্য সাহিত্যিক আজকের দিনেই বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। তবে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি একের পর এক প্রজন্মকে একই রকম ভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। তাঁর প্রয়াণ দিবসে, তাঁর সাহিত্যের জন্য, তাঁরই রচনা থেকে বলা যেতে পারে "তুমি দৃষ্টিহীন চক্ষু মেলে থাকো অসীমের পানে, বুকের শূন্যতায় ভরে নিতে চাও অন্ধকার দানে, বিরাট প্রণয়ী"

তথ্যসূত্র - শরদিন্দু অমনিবাস (দ্বিতীয় খন্ড)

You can share this post!

...

Loading...