এঞ্জিনিয়ারিং, অঙ্ক, কবিতা আর প্রেম মিলেমিশে তিনি বিনয়

আর যদি নাই আসো,ফুটন্ত জলের নভোচারী
বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,
সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি; কে জানে হয়তো অবশেষে
বিগলিত হতে পারো; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে
নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে ।

আর আসেনি। তবে ফুরিয়ে যায়নি অপেক্ষা। অনন্ত থেকে অনন্তে। অপেক্ষায় ক্লান্ত হতে হতে শহর ছেড়েছেন কবি। গ্রামের মাটির স্নিদ্ধতায় মন উজিয়েছে। আর কখনও শহরে আসেননি। বাকি জীবন প্রেমিকার মতো ভূমিতেই।
এই শহর ভুলেছে তাঁকে। কিন্তু তাঁর কবিতাকে গ্রাস করতে পারেনি রাক্ষুসে বিস্মৃতি। ঈশ্বরী ঘ্রাণের মতো জেগে থেকেছে পাঠকের অন্তরে। বিনয় মজুমদারকে ভুলতে পারেনি রোমান্টিক বাঙালি।
তিনি রয়ে গিয়েছেন মিথ আর রহস্যের আধারে।
কে তাঁর ‘চাকা’। কেন সে ফিরে তাকালো না একবার চর্চায় কেটে গিয়েছে বছরের পর বছর। তবু খোঁজ থামেনি।
এঞ্জিনিয়ারিং, অঙ্ক, কবিতা আর প্রেম মিলেমিশে একই অঙ্গে। এক বোধ থেকে সাঁতার কেটেছেন আর এক প্রবাহে।
অঙ্কের প্রতি প্রচন্ড প্যাশন ছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক।
অঙ্কের টানেই একবার চাকরির দরখাস্ত করেছিলেন জার্মানিতে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের অধ্যাপক হওয়ার ডাক এসেছিল। এক সাক্ষাৎকারে তেমন বলেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। বাবা মায়ের টানে।
চাকরি করতেন এক সময়। কিন্তু সেই চাকরিতে মন বসেনি। বাবা মানা করেছিলেন কলকাতা ফিরে আসতে। ছেলে চাকরি ছাড়ার ঝুঁকি নিক, তা তিনি চাননি। কিন্তু বিনয়ের নিয়তির টান যে অন্যদিকে। কলকাতা আর কবিতার স্পর্শ ছাড়া তিনি বাঁচতে পারেননি। ফিরে এসেছিলেন।

অনেক কিছুই তবু বিশুদ্ধ গণিত শাস্ত্র নয়
লিখিত বিশ্লিষ্ট রূপ গণিতের অআকখময়
হয় না, সে সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত গণিতসূত্রের
নির্যাস দর্শনটুকু প্রয়োগ ক’রেই বিশ্লেষণ
করা একমাত্র পথ, গণিতশাস্ত্রীয় দর্শনের
বহির্ভূত অতিরিক্ত দর্শন সম্ভবপর নয়।

বিনয় বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ পরবর্তী এক অন্য ধারা। খুব কম সময়ের জন্য তাঁর কবিজীবন। কিন্তু সেই ঘোর থেকে সারাজীবনেও বেরতে পারেনা তাঁর কবিতার পাঠক। কবি জীবনের শেষ পর্ব কাটিয়েছিলেন ঠাকুরনগরে। এই শহরে আর কখনও ফেরেননি তিনি। স্বেচ্ছা নির্বাসনেই তাঁর চলে যাওয়া

You can share this post!

...

Loading...