পুরনো শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব

বাসন্তী ভোরে দোর খুললেই গায়ে কাঁচা রোদের আলো। আমের মঞ্জরীর গন্ধে বিভোর চারপাশ।  স্নিদ্ধ নরম এক দিনের শুরু। সারা প্রকৃতি বেজে উঠছে এসরাজের সুরে। এমন ভোরে দরজায় কে যেন রেখে গিয়েছে পলাশ ফুল আর আবির। বসন্ত উৎসবের আমন্ত্রণ।

এভাবেই সূচনা হত বসন্ত উৎসবের। পুরনো শান্তিনিকেতনে। বহু যুগ আগে ফেলে আসা সময়ে। তখনও অকারণ কোলাহল আর মানুষের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে ক্লান্ত হয়নি শান্তি নিকেতনের আবহাওয়া। বাতাসের স্নিগধতা ফুরিয়ে যায় নি বিশৃঙ্খল ভিড়ে।১৯০১  সালে মাত্র ৫ জন ছাত্র নিয়ে  রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মানবিক অনুভূতি অন্য চেতনায় জেগে উঠবে প্রকৃতি কোলে, সুন্দরের সান্নিধ্যে।  রাঙা মাটির দেশে প্রত্যন্ত প্রান্তরে এক অন্য রকম যাপন। যেখানে প্রকৃতির সব রং ভারি স্পষ্ট। আপনিই এসে ধরা দেয় চোখে। তাই সব ঋতুকেই উদযাপনের আয়োজন করলেন কবি।বিশেষ করে ক্ষণ স্থায়ী বসন্ত আলাদা করে স্পর্শ করেছিল তাঁকে। কবি শান্তিনিকেতন আশ্রমে সূচনা করলেন বসন্ত উৎসবের। ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমা তিথিতে।  গোটা দেশে যখন দোল তখন আশ্রমে বসন্ত উৎসব।

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ উৎসবের শেষ বেলাকে তোমার অক্লান্ত মঞ্জুরী ঐশ্বর্য-এ দিল ভরিয়ে। নবীনের শেষ জয়ধ্বনি তোমার বীর কন্ঠে”।১৯০৭ সালে প্রাক কুটিরের সামনে এক সকাল আলোয় সূচনা হয়েছিল বসন্ত উৎসবের। প্রাক কুটির এখন শমীন্দ্র পাঠাগার। কবির অকাল প্রয়াত পুত্র শমীন্দ্রনাথ অংশ নিয়েছিলেন সেদিনের সেই ঋতু উৎসবে।পরবর্তী সময়ে সেই উৎসব হয়ে ওঠে বসন্ত উৎসব। সালটা ১৯২৫।

কবি তাঁর দীর্ঘ প্রবাস থেকে সবে ফিরেছেন শান্তিনিকেতনের ঘরে। ভরা বসন্তে রাঙা মাটির দেশ তখন ভেসে যাচ্ছে রাঙা হাসির বন্যায়। অশোকে পলাশে রাঙা নেশায় ঘোর। শাল পিয়াল বকুলে অদ্ভুত আচ্ছন্নতা। ছাব্বিশ ফাল্গুন কবির পুরনো লাইব্রেরির দোতলায় কলাভবনের ঘরে আয়োজন হল বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠানের।

এই উৎসবে কোনও ধর্মের ছাপ ছিল না। সুর, গান, ছন্দে, কবিতায় সার্বজনীন এক উৎসব। যেখানে কোনও বিভেদ নেই।আশপাশের গ্রাম, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষরা আসতেন সাবলীল ভাবে। গানে, নাচে, উচ্ছাসে মেতে উঠতেন।আশ্রম সেজে উঠত অবিরে আল্পপনায়। আশ্রমিকরা সবাই হলুদ শাড়ি আর ধুতিতে সেজে অংশ নিতেন।সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আশ্রমিকদের শোভাযাত্রা। সুরে সুরে জেগে উঠত প্রকৃতি। শ্রীভবন থেকে আম্র কুঞ্জ। কবিগুরুর পায়ে আবির দিত ছোটরা।সন্ধে বেলার বসন্ত সঙ্গীত এর পর শেষ হত অনুষ্ঠান।১৯৪০ সালে শেষ বারের মতো রবীন্দ্রনাথ অংশ নিয়েছিলেন বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানে। সেবার সিংহ সদনে হয়েছিল সেই উৎসব।পরবর্তী বছরে অসুস্থতার জন্য আর উপস্থিত থাকতে পারেননি কবি। তিনি বাণী পাঠিয়েছিলেন। লিখেছিলেন,

‘আর বার ফিরে এল উৎসবের দিন

বসন্তের অজস্র সম্মান

রুদ্ধকক্ষে দূরে আছি আমি-

এ বৎসর বৃথা হল পলাশ বনের নিমন্ত্রণ’।

 

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...