‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’

সেই কবে থেকে একজন দ্বিতীয়ের প্রার্থনা করে চলেছে মানুষ। দ্বিতীয় থেকে বহুর আকাঙ্ক্ষা তাকে দলগত জীব বানিয়েছে। সংসার করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে নিজের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক কে পরিপাটি করে নেবার কৌশল। গুহাবাসী মানুষের দেওয়ালচিত্র বিবর্তনের কত পথ পার হয়ে আজকের ওয়ালআর্ট এ পৌঁছল সে এক লম্বা ইতিহাস। কয়েক হাজার বছরের সেই পরিবর্তিন-রুচির আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। এ কেবল বাঙালী অন্দরসজ্জায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত।

একটা যুগ কে জানতে গেলে তার চালচিত্র জানাটা দরকার। নাহলে দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের আগে পর্যন্ত ভারতবর্ষ অন্দরসজ্জার দিক দিয়ে সম্পূর্ণ দুভাগে বিভক্ত ছিল। একটা লোকায়ত। আঞ্চলিক অধিবাসীরা তাদের ঐতিহ্য মতন সাজিয়ে নিতেন ঘরদোর। তাদের বেশিটাই ছিল নিম্নবিত্ত মানুষজন। সাজানো বলতে আলপনা বা স্থানীয় ধাঁচের দেওয়ালচিত্র, প্রয়োজনীয় ব্যবহার্যের আঞ্চলিক গড়ন। আর অন্য দলটি হল বিত্তবানরা। রাজা, জমিদার, সামন্ত। তাদের গৃহসজ্জার বেশিটাই বারমহল কেন্দ্রিক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিত্তের বিজ্ঞাপন হেতু। ফলে রুচির অসামঞ্জস্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রিটিশ রাজত্বে বিদেশী সৌখিনসামগ্রীর আমদানি বড়লোকদের বাড়িগুলোকে অদ্ভুত ভাবে ইউরোপিয়ান স্থাপত্য ও শিল্পের যাদুঘর বানিয়ে তুলছিল।

RABINDRANATH-2

রবীন্দ্রনাথ নিজেও সেইরকম এক জমিদার বাড়িতে বড় হয়েছেন। কিন্তু বালক বয়স থেকে বড় হবার ফাঁক ফোকরে তিনি যে দেশ বিদেশে দিন কাটানোর সৌভাগ্য পেয়েছিলেন তা মস্ত আশীর্বাদ হয়েছিল তাঁর পক্ষে আর আমাদের পক্ষেও। নিছক বাঙালী কিংবা ভারতীয় না হয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর তার নির্যাস ঝরে পড়ত তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকর্মে। এমনকী গৃহস্থাপত্য বা অন্দরসজ্জাও বঞ্চিত হয়নি সে নান্দনিক সুষমা থেকে।

এক বাড়িতে বেশিদিন থাকলে দম আটকে আসত রবীন্দ্রনাথের। শুধু শিল্পে নয় যাপনেও বৈচিত্র লাগত তাঁর। আসলে গোটা জীবনটাকে অমন আশ্চর্য এক শিল্প বানিয়ে তুলতে না পারলে কেউ বুঝি হন না রবীন্দ্রনাথ। নিয়ত অভ্যাস লাগে। নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতন অনায়াস সহজতায় জীবনে যায়গা করে দিতে হয় সুন্দরকে। সেই দিকে লাগাতার অধ্যাবসায় ছিল তাঁর। এই বিচিত্রকে ধারণ করার মতন মনও ছিল একখানা। আর ছিলেন সেই আশ্চর্য চিন্তা কে রূপ দিতে পারার মতন দুই সুযোগ্য শিল্পী, সহযোগী- কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতন আশ্রমের তৎকালীন গৃহ নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সুরেন কর মহাশয়।

‘দেহলি’ পরবর্তী যতগুলো গৃহ নির্মিত হয়েছে তাদের সবেতেই রথীন্দ্রনাথ আর সুরেন করের অনবদ্য স্থাপত্য পরিকল্পনার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের স্বাভাবিক নান্দনিকতা, শিল্পের সামঞ্জস্য ও পরিমিতি বোধ। আর এসবের মূল কাণ্ডারি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সেকালের আশ্রমিকরা মজা করে বলতেন শান্তিনিকেতনে হেন বাড়ি নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথ থাকেননি। নতুন বাড়ি হলেই তাতে উঠে গিয়ে বলতেন ‘এই বাড়িটিই ঠিক, একদম যথাযথ হয়েছে। আগের বাড়িতে অসুবিধে হচ্ছিল কত।’ এর কিছুদিন পর বাড়ি একঘেয়ে লাগলে, শুরু হত বদলের খেলা। প্রথমে আসবাব অদল বদল, তারপর ঘর বদল, তারপর আবার আসবাব বদলানো। এভাবে যখন সবরকম বদল-বৈচিত্র ফুরিয়ে আসত তখন অনুযোগ করতেন কত অসুবিধে এই বাড়িতে। আসলে ইচ্ছে নতুন বাড়ি করার। এদিকে শান্তিনিকেতনে টাকার টানাটানি। তারই মধ্যে অর্থ জমলে শুরু হয়ে যেত নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ। এই করেই ‘উদয়ন’, ‘কোনার্ক’, ‘মৃন্ময়ী’ (পরে রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই তা ভেঙে ফেলে সেখানে নতুন বাড়ি তোলা হয়), ‘শ্যামলী’, ‘পুনশ্চ’, ‘উদীচী’ নির্মিত হয়েছে।

শান্তিনিকেতন ভাবনার মূলেই ছিল ‘more light, more space’ আর রবীন্দ্রনাথ সব সময় বলতেন ‘নির্মাণ কখনো প্রকৃতিকে ছাপিয়ে যাবে না।’ ফলে শান্তিনিকেতনের সব গৃহই হয়ে উঠছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে ওঠা এক একটা আশ্চর্য স্থাপত্য। তাতে রেশ লাগছিল ভারতীয় শিল্পশৈলি, সনাতন স্থাপত্যশৌখিনতার সঙ্গে আধুনিক নির্মাণবিজ্ঞানের। মিশে যাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের এত বছরের অভিযাত্রিক জীবনের দেখাশোনা, রুচিবোধ। জন্ম নিচ্ছিল শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে লীন হয়ে যাওয়া সম্মিলিত অথচ স্বতন্ত্র শিল্পচেতনার আধুনিক ভারতবর্ষ।

এসব যখন হচ্ছে তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ষাটের ওপর। বুড়ো বয়সের খামখেলী মন এই খেলাঘর বাঁধার খেলায় কেমন বাচ্চার মতো মেতে উঠত সে বর্ণনা পাই রানী চন্দের লেখায়। সেখান থেকেই শুনি কেমন করে আসবাবের গড়ন এঁকে দিতেন। এক এক বাড়ির সাথে মানানসই এক এক আসবাব। এক এক রকম সজ্জা, গাছ। মাটির বাড়ি ‘শ্যামলী’ তে যে ধরণের অন্দরসজ্জা তার থেকে আমূল বদলে যায় উদয়নের সাজ। এই নান্দনিকতা গুলো ওঁর থেকে শিখে নিচ্ছিল সেই সময়ে ওঁর সংস্পর্শে থাকা মানুষজন। নান্দনিকতা যে একটা বোধ, বিত্তের বাইরে আপন সাধ্য ও অভিরুচি মতন যে তাকে জীবনে জায়গা দেওয়া যায় সে কথা শিখিয়ে দিচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জাপানি মানুষ দেখা করতে এসে থেকে গেল কদিন শান্তিনিকতনে, রবীন্দ্রনাথ তাকে দিয়ে জাপানের বিখ্যাত ফুল সাজানোর পদ্ধতি শিখিয়ে নিলেন আবাসিক ও ছাত্রছাত্রীদের। মনিপুরের মাদুর ও বেতের ব্যবহার শেখালেন ওয়াল ম্যাট বা বারান্দার পর্দা হিসেবে। সাঁওতালদের থেকে শিখে নিলেন মাটির কাজ, গ্রাম বাংলার মেয়ে বউদের থেকে শিখে নিলেন আলপনার ব্যবহার, বাউল-ফকিরের মাজার থেকে শিখে নিলেন ঝকঝকে উঠোন ডিঙনো পথ কে ঘরের মধ্যে তুলে নেওয়ার কৌশল। স্বদেশীকতার আবহ আর গান্ধিজীর বন্ধুতাতেই বোধহয় এসে গেল খাদি। বর্মা থেকে শিখিয়ে আনলেন বাটিক-ব্যবহার। তার সঙ্গে মিশে রইল প্রকৃতি। আরো গাছ, আরো আলো, আরো ফুল, আরো ছায়া।
দেখতে দেখতে নতুন এক শিল্পভাষ শিখে নিল বাঙালী। শিখে নিল অন্য এক রুচি। শালীন, সামঞ্জস্যপূর্ণ, ভারতীয় অথচ আন্তর্জাতিক। সব থেকে বড় কথা মধ্যবিত্ত বাঙালী তাদের ব্যবহারিক জীবনে কেবল সাফসুতরো পারিপাট্যের বাইরেও নান্দনিকতার মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল।

রবীন্দ্রনাথের জাগিয়ে দেওয়া এই আলো এখনও আমাদের কতজনের অন্দরে বিছিয়ে রয়েছে। রম্য পাত্রের প্রতিটা পুষ্পচয়ন, গৃহে রোপিত গাছ, পর্দার রঙ, দেওয়াল আলমারির নকশা, পূব জানলার পাশে ঝুলিয়ে রাখা ধানের ছড়ার বিনুনি আর লক্ষীর পট, পশ্চিম দেওয়ালে পুরুলিয়ার মুখোশ কিংবা দক্ষিণবারান্দার কোণে বাঁকুড়ার পোড়ামাটির কাজ, বসার ঘরে বাঁধিয়ে রাখা মধুবনী চিত্রের নীচে জ্বালিয়ে রাখা দক্ষিণভারতীয় প্রদীপের ব্যবহার, শোবার ঘরে ঘুমভাঙানি দৃষ্টি বরাবর উত্তরমুখীবুদ্ধের স্নিগ্ধ স্কাল্পচার – প্রভৃতির মধ্যে যে oriental aesthetics বোধ, তা উন্মেষের অনেকটা অবদান আমাদের এতদিনকার রবীন্দ্রচর্চা।
সিন্থেসিস এমন এক নীরব বহমান প্ৰক্রিয়া যে মানুষ খেয়ালই করে না কোথায় কার কাছে কেমন ভাবে বাঁধা পড়ে যায় ঋণ। শুধু মাঝে মাঝে শান্ত হয়ে বসে অন্দরমহলের মতন অন্তরমহলগুলোও গুছিয়ে নিতে পারলে চেনা যায় আলোর স্রোতপথ, উত্তরণের রবিকররেখা।

RABINDRANATH-3

 

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...