"মহিষাসুরমর্দিনী" ও রাইচাঁদ বড়াল

তখন বেতারকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হত ‘বেতার জগৎ’। সম্পাদনা করতেন প্রেমাঙ্কুর আতার্থী। একবার  বেতার অনুষ্ঠানে অভিনত্ব আনতে কী কী করা যায় তার আলোচনা চলছে। সেখানেই উঠে এল এক প্রভাতী অনুষ্ঠানের ভাবনা। প্রেমাঙ্কুর আতার্থী বললেন, ‘ রাই সুর দিক, বীরেন শ্লোক আওড়াক, ভোরবেলায় মানুষের ভালো লাগবে’।

ভাবনা শুধু ভাবনায় আটকে থাকল না, তা কাজেও ফলে গেল। ‘বসন্তেশ্বরী; লিখলেন বাণীকুমার। পাঠ করলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ঘটক আর গানে সুর দিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক আর রাইচাঁদ বড়াল। পরবর্তী সময়ে তারই অনুপ্রেরণায় বাঙালির শারদ সকালের ভোর জাগল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুরে।

পঙ্কজ মল্লিকের নাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুরকার হিসেবে যতটা শোনা যায়, কিছুটা আড়ালে যেন  রাইচাঁদ বড়ালের নাম।

কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীতক্ষেত্রে রাইচাঁদ বড়াল এক মহীরুহ ব্যক্তিত্ব। এদেশে বলিউড সঙ্গীতের জনক বলা হত তাঁকে। ভারতীয় ছবির সঙ্গীতে ‘ পিতামহ ভীষ্ম’।

জন্ম কলকাতায়। বাবা সঙ্গীতগুরু লালচাঁদ বড়াল। পুত্রের সঙ্গীতজীবন যাতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ছোট থেকেই সেদিকে কড়া নজর রেখেছিলেন বাবা।      

তারপর তাকে শেখানোর জন্য বিখ্যাত রামপুর ও গোয়ালিয়র ঘরানার প্রখ্যাত ওস্তাদবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন ওস্তাদ মুশতাক হোসেন খান, ওস্তাদ মসীত খান (তবলা নেওয়াজ) এবং ওস্তাদ হাফিজ আলী খান (সরোদিয়া)। অল্প বয়সেই রাইচাঁদ লক্ষ্মৌ, এলাহাবাদ এবেং বেনারসে সঙ্গীতত সম্মেলনে তবলায় ‘সাথসঙ্গত’ এ অংশগ্রহণ করেন।

১৯২৭ সালে ই-িয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানীর সূচনালগ্নেই রাইচাঁদ যোগ দেন বেতারকেন্দ্রে।

কলকাতার টালিগঞ্জে প্রথম ফিল্ম স্টুডিও নিউ থিয়েটার্স প্রতিষ্ঠিত হল ১৯৩১ সালে। প্রথম থেকেই সেখানে রাইচাঁদ বড়াল।

ভারতীয় চলচ্চিত্র যখন কথা বলতে সেখেনি সেই সময় থেকে যুগে মঞ্চে সরাসরি সঙ্গীত পরিচালনা করতেন। ১৯৩১ সালে সবাক চিত্র ‘দেনা পাওনা’তে সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

তিনি সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে বাংলা সুরের সাথে উত্তর ভারতীয় গজল রীতির ফিউশন ঘটান।

চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়নেরও তিনি প্রবর্তক। ১৯৩৫ সালে হিন্দি ছায়াছবি ‘ধূপছাওঁ’তে একটি নৃত্যদৃশ্যে এই গানটির প্লেব্যাক করা হয়।

নিউ থিয়েটার্সের প্রায় ৪০টি সিনেমায় তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ১৯৫৩ সালে পাড়ি দিলেন মুম্বই। যান। এ বছরই দর্দ-এ-দিল ছবিতে তাঁর প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা। ১৯৭৮ সালে রাইচাঁদ বড়াল ভারতীয় সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ লাভ করেন। একই বছর তিনি সঙ্গীত, নাটক একাডেমী পুরস্কারও পান।

১৯৮১ সালে ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...