জীবনের মাঠে মহারাজের হাফ সেঞ্চুরি

আলিপুরের চিড়িয়াখানা বা সুন্দরবনে গেলে আপনি বাঘ দেখতে পাবেন, কিন্তু সব বাঘ তো আর নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকে না! কয়েকটা বাঘ শহরেই হেঁটে চলে বেড়ায়। বাঙালির রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আজ তাঁর জন্মদিন। ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনেই মহারাজের জন্ম হয়েছিল।
 
FotoJet (70)
 
ভারত তথা বিশ্ব ক্রিকেট তাঁকে 'দাদা' নামেই ডাকে, প্রিন্স অফ ক্যালকাটা বলে সমীহ করে। একবিংশ শতকে বাঙালির স্পর্ধার নাম সৌরভ। বাঙালি যাদের নিয়ে গর্ব করে, তাদের মধ্যে একজন তিনি। সৌরভের অনেক পরিচয়, প্রাক্তন জাতীয় দলের অধিনায়ক বলা ভাল সর্বকালের সেরা ভারত অধিনায়ক সৌরভ। একজন দক্ষ ক্রিকেট প্রশাসক এবং অসাধারণ ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের প্রাক্তন সভাপতি সৌরভ বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ৩৯ তম সভাপতি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ক্রিকেটার হিসেবে সফল তো বটেই, সেই সঙ্গে তিনি সফল প্রশাসকও। ২০১৪ সালে সিএবির সভাপতি হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন সৌরভ। সেই শুরু প্রশাসক জীবনের পথ চলা। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। বোর্ডের ৩৯ তম সভাপতি হিসেবে তাঁকে চান ক্রিকেট মহলের কর্তা ব্যক্তিরা। আবার একটি নলেজ গেম শো-এর দুর্ধর্ষ সঞ্চালক।
 
রঞ্জি ট্রফি ফাইনালে দাদা স্নেহাশীষের জায়গায় সৌরভের অভিষেক হয়। বাংলা রঞ্জি জেতে, আর বাকিটা ইতিহাস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সেরা বাঁ হাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অন্যতম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সাদা জার্সিতে ১১৩টি টেস্টে ৭২১২ রান করেছেন। ব্যক্তিগত সেরা ২৩৯ তাও ঘরের মাঠ ইডেন গার্ডেনসে। ৩১১টি একদিনের ম্যাচে সৌরভের মোট রান ১১,৩৬৩। ব্যক্তিগত সেরা ১৮৩, টনটনে অর্জুন রনতুঙ্গার শ্রীলঙ্কাকে দুর্মুষ করা সেই ইনিংস মনে পড়ে! সৌরভ ডান হাতে বল ঘুরিয়ে একদিবসীয় ক্রিকেটে ১০০টি শিকার করেছেন।
 
২০০০ সালে ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে জর্জরিত ভারতীয় ক্রিকেট, সেই সময় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলেন এক বাঙালিকে। চ্যালেঞ্জ নেওয়া যে বাঙালির রক্ত তা ভুললে চলে? সেই বাঙালিই ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের হয়ে উঠল। তাঁর নেতৃত্বেই ২০০০ সালের আইসিসি নকআউট ট্রফির ফাইনালে পৌঁছেছিল টিম ইন্ডিয়া। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ও একদিনের সিরিজ জয়। পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানকে হারানো। টানা ১৬টা টেস্ট জেতা অশ্বমেধের ঘোড়া অজিদের ইডেনে ফলোঅন খাইয়ে ২-১ হারিয়ে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল সৌরভের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে নেয় সৌরভের টিম ইন্ডিয়া। 
 
২০০৩ সালে বিশ্বকাপ ফাইনাল, ১৯৮৩-র বিশ্বকাপের পর প্রথমবার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছল ভারত। ওয়ান্ডার্সে স্বপ্ন ভঙ্গ! ফাইনালে ক্যাঙ্গারুদের কাছে পরাজয়। ২০০৩ বিশ্বকাপে সৌরভের ব্যাট থেকে ৩টে শতরান ৪৬৫ রান এসেছিল। এরপর ২০০৫ সালের গ্রেগ চ্যাপেল পর্ব। বাদ পড়েন সৌরভ। বাঙালি তো লড়তে জানে, মন্ত্র বলতে তো জিতে ফিরে আসা। ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে জাতীয় দলে কামব্যাক করেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ব্যাট করতে নেমে ৮৩ রানের ইনিংস ঝকঝকে ইনিংস খেললেন সৌরভ। প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে জিতল ভারত। দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দলে ডাক পেলেন। দুই সিরিজেই নিজের সেরাটা দিলেন, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ম্যান অফ দ্য সিরিজ হন সৌরভ। মহারাজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হল।
 
২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান করেন সৌরভ। গ্রুপ স্টেজে হেরেই বিশ্বকাপের বাইরে চলে যায় টিম ইন্ডিয়া।
২০০৭ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিজের প্রথম দ্বিশতরান করেন সৌরভ। ওই বছর টেস্টে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান স্কোরার ছিলেন তিনি। সে বছর একদিনের ক্রিকেটেও প্রথম পাঁচজনের মধ্যে জায়গা করে নেন সৌরভ। বিশ্ব টেস্ট একাদশেও স্থান পান। ২০০৮ নাগপুরে অবসর ঘোষণা, অস্ট্রেলিয়া সিরিজ চলাকালীন এল বাঙালির দুঃখের দিন। দুর্গা পুজোর অষ্টমীর দিন সেই ঘোষণা প্রকাশ্যে আসে, বাঙালি অকাল বিসর্জনের বিষাদে ডুবে যায়। যদিও এরপরে কয়েক বছর আইপিএল খেলেছেন মহারাজ।
 
ভারতীয় ক্রিকেটকে এক সোনালী অধ্যায় দিয়ে গিয়েছেন সৌরভ। দেশের বাইরে দলকে জিতিয়েছেন, একের পর এক খেলোয়াড় গড়েছেন। যারা পরবর্তী দশকে ভারতীয় ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন। গড়েছেন একের পর এক বিশ্ব রেকর্ড। তিনি বাঙালির গর্ব, বাংলার গর্ব।​
 
বাঙালিকে অনেক আত্মতৃপ্তির মুহূর্ত দিয়েছেন সৌরভ, ১৯৯৬-এর জুন লর্ডসের সেঞ্চুরি, ব্রিসবেনের ১৪৪, লর্ডসের ব্যালকনি থেকে জামা ওড়ানো বা অস্ট্রেলিয় ক্যাপ্টেন স্টিভ ওয়াকে টসে অপেক্ষা করানো, টরেন্টোর ম্যান অফ দ্যি সিরিজ, বাপি বাড়ি যার ছক্কা। আজও বাঙালির গ্রে সেলকে উত্তেজিত করে। হৃদযন্ত্রের গতি বাড়িয়ে দেয়। অফসাইডের ঈশ্বরকে আজও বাঙালির পুজো করেন, তিনিই তো বাঙালিকে সম্ভ্রম আদায় করতে শিখিয়েছেন।
 
এভারেস্ট ডিঙানোর স্বপ্ন বাঙালিই দেখতে পারে। হ্যাঁ! তবে আপনি রাধানাথ শিকদারের মতো তাঁর নাম মুছে দিতেই পারেন। কিন্তু তিনি স্বপ্রতিভায় আবার ফিরবেন। তবে ফিরবেনই বা কোথায়...তিনি গিয়েছিলেন নাকি? তাই লোকে ওঁকে বাবা নয় দাদা বলে। এখনও অনেক দাদাগিরি দেখানো বাকি...শুভ পঞ্চাশ।  
 

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...