আজ পরমহংসদেবের জন্মতিথি, তিনিই কি আধাত্মিক নবজাগরণের পথিকৃৎ?

আজ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথি, ১৮৩৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলার ৬ ফাল্গুন ১২৪২ বঙ্গাব্দে তাঁর জন্ম। হুগলির কামারপুকুরে গদাধর চট্টোপাধ্যায় থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের ঠাকুর, জগন্মাতার সন্তান। কালীরূপী জগন্মাতার জগতের মা হয়ে ওঠার সেতু বন্ধনে ছিলেন গদাধার। মা মানেই স্নেহ, মমতা, ভালবাসা, আশ্রয়। ভক্তি ও প্রেমের মধ্যে দিয়ে সেই মাকেই প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন পরমহংস। অকৃত্রিম সারল্যে মানুষে-মানুষে, ধর্মে-ধর্মে বৈরিতা ঘুচিয়েছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা মানুষ। সারাজীবন সে'ভাবেই থাকলেন তিনি। পৌঁছলেন মাটির কাছে, মাটির মানুষের কাছে। পাণ্ডিত্যের আড়ম্বর নয়, সহজ ভাষা, সরল প্রকাশ, জলের মতো স্বচ্ছ তার মাধ্যম। একবর্ণও কিছু লেখেননি তিনি। সব তাঁর অনুভূতিজাত। নিজের বিশ্বাস ও জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন অবলীলায়। কেবল মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, অকাতরে অর্জিত জ্ঞান বিলিয়েছেন। সাধারণ সহজবোধ্যভাবে অনর্গল প্রকাশ করেছেন নিজেকে। তাঁর প্রাজ্ঞ, পাণ্ডিত্য সমাজের উঁচুস্তরে থেকে শুরু করে নিরক্ষর মানুষজনকে পর্যন্ত ছুঁয়েছে। আলোকিত করেছে।

ঠাকুরের কথাধর্মী লোকশিক্ষাগুলো এ যুগেও প্রাসঙ্গিক, সমসময়ের থেকে আধুনিক বৈকি। বাক্য বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ দর্শনচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছিল তাঁর ভক্তবৃন্দের মধ্যে। হাতিয়ার করেছেন সঙ্গীতকে। জন্ম থেকেই তাঁর সাধকসত্ত্বার বিকশিত ছিল, যাত্রাপালা, গান, কীর্তন তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে। আনুষ্ঠানিক পড়াশুনা তাঁকে জ্ঞানী করেনি। তাঁর মেধা ছিল অন্তরস্থ। অনন্য শ্রুতিধরের ক্ষমতা ছিল তাঁর, ছিল আত্মস্থ করার ক্ষমতাও।

যেকোনও সাধক, মহাপুরুষই নিজেকে গভীর অন্তর-দর্শনের সাধনায় নিমগ্ন রাখেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যেতেন। আত্মদর্শনকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তোলার মাধ্যম হিসেবে তিনি বারবার হাতিয়ার করেছে লোকশিক্ষাকে। উত্তর খুঁজেছেন সঙ্গীতে। সঙ্গীতপথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধনরূপের ধারক ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। সাধক হিসেবে তা ব্যতিক্রমীও। তাঁর অনন্ত-অন্বেষণ, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে দিন যত এগিয়েছে, মানবজগতকে দেখার শক্তি-সঞ্চয়ের অন্যতম এক নিশ্চিত পথ খুঁজে গিয়েছেন। বাল্যকালে কামারপুকুরে থাকাকালীন, যাত্রাপালায়, লাহা-বাড়ির অতিথিশালায় আসা সাধুসন্তদের ভজনের আসরে, চণ্ডীমণ্ডপের কীর্তন পালাগানের জমায়েতে গদাধর গাইতে, পরমহংস হয়েও সে অভ্যাস ছাড়েননি। শিষ্য গিরিশকে বলেছেন লোক শিক্ষে কর। নাটককেও হাতিয়ার করার নির্দেশ দিয়েছেন। আজীবন বলেছেন নরেন শিক্ষে দেবে, কোন শিক্ষা? সহজ থেকে সহজতর হওয়ার শিক্ষা। অন্তর-দর্শনের শিক্ষা।

রামকৃষ্ণ পরমহংসের আবির্ভাব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে। সাধারণ মানুষকে তিনি চৈতন্যলোকের খোঁজ দিয়েছেন। কেবল আপনার মুক্তি নয়, জগতের মুক্তি। সমষ্টির সুখ-সমৃদ্ধি প্রাধান্য পেল তাঁর চিন্তায়। ধর্মের সারসত্যকে ছড়িয়ে দিয়েছেন দক্ষিণেশ্বরে তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভাবান্দলোনের মধ্যে দিয়ে। জীবে ব্রহ্মের অবস্থান, তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হল শিবজ্ঞানে জীবসেবার কথা। আধ্যাত্মিক নবজাগরণের পথিকৃত হয়ে উঠলেন ঠাকুর।

শিবজ্ঞানে জীবসেবার আদর্শকে নিজের জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করেছিলেন নিজ হাতে। প্রতিটি ধর্মের উৎস যেখানেই হোক না কেন, তা একটি সত্যেই মিলিত হয়। সেই সত্য উদার এবং মানবিক। যে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মবোধের কথা আজ জগৎ বলে, যা মেনে চলার জন্য সংবিধানের দরকার পড়ে, তার প্রতিষ্ঠা শ্রীরামকৃষ্ণরই হাতে। জীবন ত্যাগের আগে পার্ষদদের হাতে গৈরিক বসন তুলে দিয়ে, মানবকল্যাণে ব্রতী হতে বলেছিলেন।

রামকৃষ্ণ কোনও বিশেষ ধর্মমত প্রচার করেননি, কোনও স্বতন্ত্র ধর্মগোষ্ঠী গড়েননি, উল্টে যা নিত্যসত্য, সর্বকালীন ও সর্বজনীন তার সত্য রূপ চিনিয়েছেন জগতকে। শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন খালি পেটে ধর্ম হয় না। ভরা পেটে মানুষ আবার আত্মসুখী হয়ে ওঠে। আধ্যাত্মিকতা মানে কেবল জপ-ধ্যান-তীর্থ ভ্রমণ নয়। জগৎ ও মানব জীবনের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা, হিংসা, লোভ, মোহের মতো রিপুরকে জয় করার সাধনাই ধর্মপথ। অন্তরের বিদ্বেষ বিষের কারণেই, জগতের নিরন্তর আনন্দধারা অধরা থেকে যায়। রামকৃষ্ণ বলেছেন, নিরাসক্তি আয়ত্ত করতে। সত্যকে তিনি জীবনে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। মানুষের মধ্যেই আছে দেবত্ব। সেই দেবত্বের খোঁজ যদি পায় মানুষ, তবে সে প্রকৃত অর্থেই অমৃতের সন্তান হয়ে উঠবে। এত সহজ করে ধর্মের ব্যাখ্যা কেউ করতে পারেননি। তাই আধ্যাত্মিক নবজাগরণের কান্ডারি অন্য সব্বার থেকে আলাদা, অনন্য।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...