ডাক্তার, উকিল, মাস্টার হওয়ার মাঝেই রিক হতে চেয়েছে ‘বোকা’! কারণ শুনলে বাকরুদ্ধ হবেন আপনিও

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘অমলকান্তি’ কবিতাটি মনে ধরেছিল অনেকের। বড় হয়ে কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল আবার কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিল। কিন্তু ‘অমলকান্তি’ কি হতে চেয়েছিলেন জানেন? রোদ্দুর!

কিন্তু এইরকম ইচ্ছা আজকাল কি আর কারোর হয়? কে-ই বা হতে চাইবে রোদ্দুর? এখন তো সবাই কেরিয়ারের ‘ইঁদুর দৌড়’ প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেখানে রোদ্দুর হওয়ার কথা কতজনই বা বলে।

কিন্তু এরকম অবাক ঘটনাই ঘটেছে লাভপুরের শীতলগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে! সেখানের মাস্টারমশাই জানতেন না যে তাঁর ক্লাসরুমেও লুকোনো রয়েছে রোদ্দুর! হ্যাঁ, শুনবেন সেই গল্প? চলুন —  

লাভপুরের শীতলগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির সেই ক্লাসরুমের মাস্টারমশাই খুদে পড়ুয়াদের জিজ্ঞেস করেছিল, কী হতে চাও বড় হয়ে? এরপর উত্তর দিতে একে একে বলছিল যে তারা কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ মাস্টার, আবার কেউ পুলিশ তো কেউ সিআইডি অফিসার। সবার শেষে উত্তর দিতে উঠে দাঁড়াল ছোট্ট রিক। মুখে মিষ্টি মায়াভরা হাসি নিয়ে সে বলে উঠল, ‘‘আমি বোকা হতে চাই।’’

এই কথা শুনে অবাক হয়ে যান মাস্টারমশাই। মনে সংশয় নিয়েই ছোট্ট ছেলেটাকে ফের বললেন ‘‘বোকা হলে তো তোমাকে সবাই ঠকিয়ে নেবে!’’ মাস্টারমশাইয়ের কথা শুনে রিক হাসতেই থাকে। আর সে উত্তর দেয়, ‘‘ঠকিয়ে নেয় তো নেবে! বোকা হলে আমি তো কাউকে ঠকিয়ে নিতে পারব না।’’

এই কথা শুনে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে যান মাস্টারমশাই। ছোট্ট ছেলেটির কথাগুলো চমকে দেয় তাঁকে। এরপরেই রিকের কথাগুলোর ভিডিয়ো করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দেন সেই স্কুলের শিক্ষক রিপনকান্তি বালা। যারা যারা এই ভিডিয়ো দেখেছে, কথাগুলো নাড়িয়ে দেয় সকলকে।

মনে হচ্ছে যেন রোদ্দুর হতে চাওয়া সেই অমলকান্তি-ই হয়তো বন্ধু রিককে পাঠিয়েছে সকলের মাঝে! হয়েতো রিককে শুধু অমলকান্তি নয়, ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির ‘দ্য ইডিয়ট’ উপন্যাসের মিশকিনও চেনে তাঁকে!  নাকি নচিকেতা এই ছোট্ট রিকের জন্যই গানটা লিখেছেন, ‘তবু আমি বোকাই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন’?

“কেন রিক, কেন চাও বোকা হতে?”

এই প্রশ্নের উত্তর শুনে ছিটকে পড়ে বিদ্যালয়ের সবাই।

লাজুক হাসি হেসে রিক বলে, ‘‘বাবাকে বলতে শুনেছি, ‘বোকা পেয়ে সবাই আমাকে ঠকিয়ে নিচ্ছে।’ কিন্তু বাবা কাউকে ঠকিয়েছে, এমনটা শুনিনি। বাবার মতো আমিও কাউকে ঠকাতে চাই না।’’

রিকের এই কথাগুলো যেন এই ছুটন্ত সময়ে সকলের চোখে ধুলো হয়ে লাগল!

লাভপুরের শীতলগ্রামের বাড়িতেই থাকে ছোট্ট রিক বাগদি। বাবা অভিজিৎ বাগদি পেশায় দিনমজুর এবং মা সুমিন্দা বাড়ি সামলান। তাঁরা দুজনেই বলেছেন যা তাঁদের ছেলে রিক নাকি মাঝেমধ্যেই এরকম অনেক কথা বলে, যা ভাবিয়ে তোলে তাঁদের।

শুধু তাই-ই নয়, রিকের মাস্টারমশাই রিপন জানিয়েছেন যে ‘বোকা’ হতে চাইলেও রিক পড়াশোনায় মোটেই খারাপ নয়। তবে সে বরাবরই নির্বিরোধী। সে কারও সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটিতে জড়ায় না। সেটা বসার জায়গা থেকে শুরু করে খেলায় হারজিত— কোথাওই কোনও প্রতিযোগিতায় নিজেকে জড়ায় না ছোট্ট রিক।

বড়ই শান্তপ্রিয় ছেলে সে!

ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শান্তনু ঘোষও এদিন রিকের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যান। তিনি বললেন যে রিকের কথায় ধরা পড়েছে গভীর জীবনবোধ। তিনি আশা রাখছেন যে ভবিষ্যতে সে হয়ে উঠেবে একজন সৎ নাগরিক।

অন্যদিকে, স্কুলের এক অভিভাবক সুমন্ত ঘোষ, সমাজকর্মী তথা লাভপুর সত্যনারায়ণ শিক্ষা নিকেতন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়রা বলেছেন যে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া একটি ছেলের মুখে এমন ভাবনার কথা কল্পনাই করা যায় না। ফলে এমন মনোভাব প্রতিটি মানুষের কাছেই কাম্য।

যতই লোকে বলুক যে ‘খোকা, তোর মতো আর দেখি নাই তো বোকা।’ তবুও এই কথাটাই যেন হোক সকলের মনে ‘খুশীর কথা’। ঠিক যেমন রবী ঠাকুর বলে গিয়েছিল ‘জ্যোতিষ-শাস্ত্র’ কবিতায়!

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...