কিভাবে টেরেসা ‘মাদার টেরেসা’ হয়ে উঠলেন? জন্মবার্ষিকীতে কিছু কথা

বিশ্ব শুধু রুটির জন্য ক্ষুধিত নয়, প্রেমের জন্যও বটে৷” — এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি দিয়েছেন তিনি সেই ‘প্রেম’ সারাজীবন বিলিয়েছেন গোটা বিশ্বকে। আজ ২৬-এ আগস্ট। আজকে তাঁরই জন্মদিবস। আঠারো বছর বয়সে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সন্ন্যাস নেওয়ার। তিনি হলেন মাদার টেরেসা পরনে নীল পাড় সাদা সুতির শাড়ি ও বাম কাঁধে পবিত্র ক্রুশ। পৃথিবীতে যাঁরা অসহায় মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে তাদের সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদের মধ্যে তিনি হচ্ছেন একজন অন্যতম নারী।

Mother Teresa 112th Birthday

মাদার টেরেসা র কথা বলা হলেই বিশ্বাস, দয়া, মমতা, মানবিকতা সেবাযত্নের মতো শব্দগুলির কথাই সবার আগে মাথায় আসে। তিনি ছিলেন বিশ্বের সমস্ত উচ্চ- নীচ অভাবীদের একটা আশার আলো। সবাইকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাদের কাছে ‘ঈশ্বর’।

কিন্তু তাঁর নাম আগে ‘টেরেসা’ ছিল না। তাঁর নাম ছিল ‘অ্যাগনেস’। সেই সম যুগোস্লোভিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম স্কোপজ। সেখানেই ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে এক আলবেনিয় রোমান ক্যাথলিক কৃষক পরিবারে জন্ম হয় অ্যাগনেসের।

ছোট্ট অ্যাগনেসকে অল্পবয়স থেকেই সন্ন্যাসিনীদের জীবন-কাহিনির গল্পগুলোয় ও ধর্মীয় কাজকর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতো তাঁকে। তাই ১৮ বছর বয়সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিশ্বের উচ্চ- নীচ মানুষদের সেবাতেই জীবন অর্পণ করবেন তিনি। তারপর তিনি যোগ দেন আয়ারল্যান্ডের লরেটো সন্ন্যাসিনীদের সংস্থায়। এরপর ১৯২৯ সালে তিনি এসে পৌঁছালেন ভারতে। সেখানেই জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। তারপর সিস্টার অ্যাগনেস কলকাতায় লরেটো কনভেন্ট স্কুলে পড়ানো শুরু করেন। পড়ানোর ফাঁকেই অসহায় মানুষদের সেবা চালিয়ে যেতে থাকেন । স্কুল সংলগ্ন এলাকায় ছিল এক দরিদ্র বস্তি, সেখানেই মানুষদের সেবা করাই ছিল তাঁর প্রথম পথ চলা।

১৯৪৩ সালের সময়, কলকাতায় দুর্ভিক্ষ চলছিল। সেই সময় 'সিস্টার টেরেসা' ক্ষুধার্ত শহরের হাহাকার দেখেছিলেন । এরপর ১৯৮৬ সালে চারিদিক দাঙ্গায় মেতে ওঠে শহর। সেই হিংসার ছবি দেখে টেরেসার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠত। তাঁর অন্তর আরও কাঁদত ওই অভাগা অনাথ অসহায় শিশুদের কথা ভেবে।

আবার অন্যদিকে সমাজে তখন ছড়িয়ে পড়েছিল কুষ্ঠ রোগ। যারা এই রোগের আক্রান্ত হতেন তাদের ঠাঁই হত না কোথাও। কিন্তু পরম স্নেহে এবং ভালোবাসায় তাঁদেরই কোলে তুলে নিয়ে আপন করে নিলেন অ্যাগনেস।   কিন্তু এই ছোঁয়াচে রোগকে আপন করে নিলেন কেন টেরাসা? তিনি সেই সময় জানিয়েছিলেন- 'আমি যখন কুষ্ঠ রোগীর সেবা করি তখন ভাবি আমি ভগবানের সেবা করছি'। এরপর তিনি বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময় শরণার্থীদের কাছে ‘মা’ হয়ে উঠলেন সিস্টার। তারপর থেকেই 'সিস্টার অ্যাগনেস' থেকে তিনি হয়ে উঠলেন 'মাদার টেরেসা'। 

মাদার টেরেসা সেই অসহায় মানুষদের কথা মাথায় রেখে ১৯৫০ সালে ‘দ্য মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ নামে একটি খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারণা সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে ৪৫০০-এরও বেশি সন্ন্যাসিনী আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ২০১২ সালের মধ্যে মোট ১৩৩টি দেশে তাঁর এই সেবাশুশ্রুর ধারা চলতেই থাকে।তিনি মনে করতেন যে গরিবের সেবা করতে হলে গরিব হয়ে তাদের মধ্যে থেকেই তা করতে হবে। তিনি তাঁর পুরোটা জীবন এটা মাথায় রেখে গেছেন। ধীরে ধীরে তিনি তাঁর সেবা প্রতিষ্ঠান সুন্দর করে গড়ে তুলতে লাগলেন। তাঁর চেষ্টায় একে একে তৈরি হয় নির্মল হৃদয়’, ‘শিশু ভবন’, ‘প্রেমদান’, ‘দয়াদান’। দুঃখী-দুঃস্থ-আর্ত-জর্জরিত মানুষদের তিনি মায়ের স্নেহ ও মমতায় নিজের কোলে তুলে নিতেন। 

মাদার টেরেসা তাঁর সারা জীবনে মানুষ সেবা করায় পদ্মশ্রী থেকে শুরু করে ভারতরত্ন, ম্যাগসেসে, পোপ জন শান্তি পুরস্কার, গুডসামারিটান, জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অ্যাওয়ার্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে নোবেল প্রাইজ, এই সব পুরস্কার এবং সন্মাননা পেয়েছেন। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ সালে মাদার টেরেসার মৃত্যু হয়। তবে, ২০১৬-এসন্ত” উপাধিতে ভূষিত করেন রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ ফ্রান্সিস।

জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর মাদার টেরেসা অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন তাদের কাছে। মাদার টেরেসা আজও এক আলোর পথযাত্রী, যেই পথে মানবপ্রেমের জন্য এক আদর্শের পথ এবং সেই পথে সকল অসহায় মানুষরাই হল ঈশ্বর।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...