সরু গোঁফ। ভ্রমর কালো চোখ। গাত্রবর্ণ সবুজ। দশাসই চেহারা। ভুঁড়িটিও দেখা যায়। প্রথম দর্শনে দেখে মনে হবে তিনি নির্ঘাত বঙ্গদেশের প্রাচীন কোনও রাজা। তেমনি তাঁর রানী। অতসী বর্ণা, টানা কাজলে চোখ, চিকচিক করে ওঠে নাকের নথ। যেমন রাজামশাই মানানসই রানী মা। রাজার নামেই প্রজাদের বাস। রাজার নামে স্থান মাহাত্ম্য। রাজার নাম রাম রাজা। তাঁর নামেই ভূমির নাম হল রামরাজাতলা। লোকমুখে রামতলা।
হাওড়া জেলার সাঁত্রাগাছি অঞ্চল সংলগ্ন প্রাচীন জনপদ। সংস্কৃত পন্ডিত, তার্কিক, বেদাঙ্গ-বেদান্ত চর্চার কারণে অঞ্চলে সরস্বতী পুজোর চল ছিল। সেই থানই কালক্রমে হয়ে উঠল রাম রাজার জনপদ। কী করে ঘটল এই বদল? সেই কাহিনি জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে আনুমানিক তিনশো বছর আগে।
সেই সময় সাঁত্রাগাছি অঞ্চলের জমিদার ছিলেন অযোধ্যারাম চৌধুরী। তিনি একদিন স্বপ্নাদেশ পেলেন রামসীতার মূর্তি তৈরী করে পুজো শুরু করার। আয়োজনে কোনও ত্রুটি হল না, কুলপণ্ডিত হলধর ন্যায়রত্নের পরামর্শে সেই মূর্তি তিনি মহাসমারোহে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু বাধা এল স্থানীয় মানুষের থেকে। কারণ সেই সরস্বতী পুজো।
এই অঞ্চলে ধূমধাম করে সরস্বতী পুজো হত। স্থানীয় জন সাধারণ মেতে উঠত সেই উৎসবে। এখন নতুন করে সেই পুজোর জায়গা রামপুজো হলে কি বদলে যাবে সব রীতি রেওয়াজ? শেষ পর্যন্ত জমিদার মশাই সকলের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করলেন রামপুজো হবে কিন্তু রামসীতার উপরে স্থান পাবেন বাগদেবী। সরস্বতী পুজোর দিন থেকে শুরু হবে রামসীতার মূর্তি তৈরীর কাজ এবঙ্গ প্রারম্ভিক পুজো। এই সমাধানের পথেই গড়ে উঠল নতুন রীতি। সকলে তা মেনেও নিলেন।
আজও সরস্বতী পুজোর দিন রামরাজাতলার কাছে ষষ্ঠীতলার নির্দিষ্ট বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে সূচনা হয় রামপুজোর। রামের মূর্তির উপরে থাকে দেবী সরস্বতীর পাঁচটি মূর্তি। এছাড়াও শিব, ব্রহ্মা সহ প্রায় আরো ২৬টি দেবদেবীর মূর্তি থাকে। ২৮ ফুট উচ্চতার সুবিশাল রাম মূর্তির সঙ্গে। এছাড়া আছেন দেবী জগদ্ধাত্রী-র দুটি মূর্তি,এক্কেবারে উপরে বসুদেব, রামের দুইপাশে লক্ষণ ,ভরত ,শত্রুঘ্ন ,বিভীষণ ,হনুমান ,জাম্বুবান ,শিবের অনুচর নন্দী-ভৃঙ্গি ইত্যাদি ।
রামঠাকুরের জন্য আছে স্থায়ী মন্দির চত্বর। রামপুজোর সময় জমজমাট হয়ে ওঠে। কয়েক বছর হল সাবেকী মন্দির ভেঙে শ্বেতপাথরে মুড়ে দেওয়া হয়েছে চত্বর। সে নিয়ে ক্ষোভও আছে সাধারণের মধ্যে। তা সত্বেও মন্দিরের টান কমেনি। বৈশাখ মাসের রামনবমী তিথিতে রামসীতার আনুষ্ঠানিক পুজো শুরু হয়। চলে চার মাস ধরে। শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার হয় বিসর্জন। রাম পুজো উপলক্ষে মন্দির চত্বরে মেলাও বসে।
অতীতে রামপুজো হত তিনদিন ধরে। তারপর তা বেড়ে হয় ১৫ দিন, পরে একমাস।
এই চত্বরে রামসীতার মন্দির ছাড়াও আছেন দশাবতার সাবিত্রী সত্যবান এবঙ্গ মহাবীরের আলাদা আলদা মন্দির। আম ভারতের ‘জয় হনুমানজী’, রামরাজাতলায় ‘মহাবীর’। মূর্তিতেও পুরোদস্তুর বাঙালি ছাপ ঠিক রামরাজার মতোই।
শোনা যায় এই মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন স্বয়ং মা সারদা। হাওড়ার শিবপুরের কাছে রামকৃষ্ণপুরে শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্য নবগোপাল ঘোষের বাড়ি থেকে ১৯০৯-এ মা সারদা রামরাজাতলায় আসেন রামঠাকুরের দর্শন করতে। মন্দিরের পাশে তখন একটি পুকুর ছিল, সেখানে পা ধুয়ে তিনি মন্দিরে প্রবেশ করেন ও রামরাজার মূর্তি দর্শন করেন।
রাম ঠাকুরের বিসর্জন হয় শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার। শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয় চারটি বিশাল প্রতিমা। প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। হাওড়ার বিখ্যাত সং দেখা যায় শোভাযাত্রায়। স্থানীয় চ্যানেলে দেখানো হয় রাম বিসর্জন।
In English

