কালী কথা: বঙ্গের দুই মন্দিরে কালী বাবু হয়ে বসে আছেন শিবের বুকের উপর

দেবী কালিকার দাঁড়িয়ে থাকা রূপই আমাদের কাছে প্রচলিত। কিন্তু বাংলা তো নিজেই বৈচিত্রের আধার। এখানে বসে থাকা কালী মায়েরও দেখা মিলবে। বসা কালী মূর্তি আর পাঁচটা সাধারণ কালী মূর্তি থেকে একেবারে আলাদা। বসা কালী মূর্তির কথা উঠলেই রামদুলাল দে সরকার স্ট্রিটের বসা কালী মূর্তির কথা এসে পড়ে কিন্তু এটিই একমাত্র মন্দির নয়, যেখানে বসা কালী মূর্তির দেখা মেলে। বাংলায় রয়েছে দুটি বসা কালী মূর্তি। একটি কলকাতার রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে, আর অন্যটি নবদ্বীপের পোড়ামাতলায়। সমাপতন দেখুন নবদ্বীপ তথা নদীয়ার কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই বঙ্গের কালীর রূপ দান করেছিলেন। আর তাঁর জেলাতেই বিরাজ করছেন আরও এক বসা কালী। এমন নামকরণের তাৎপর্য রয়েছে। শায়িত মহাদেবের বুকের উপর দেবী বাবু হয়ে বসে থাকেন।

সেকালের কলকাতা অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন রামদুলাল দে সরকার। তাঁর নামে পরবর্তীতে রাস্তা হয়েছে, রামদুলাল দে সরকার স্ট্রিট। সেই রাস্তার উপরেই সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে সোজা যে রাস্তা হেদুয়ার দিকে চলে গিয়েছে। সে রাস্তায় ঢুকেই বাম হাতে পড়বে দেবী কালিকার মন্দির। ১৬০/২, রামদুলাল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৬। হেদুয়া পার্কের উল্টো দিকে, বেথুন কলেজের পাশের রাস্তা ধরে সোজা গেলে ডানদিকে রাস্তার ধারে 'বসা কালী মন্দির'। মন্দির বলতে আলাদা কোনও জায়গা নয়, অতিকায় নাট মন্দির, বিশালাকার প্রাঙ্গণ, পুষ্করিনী কিছুই নেই। চিরাচরিত মন্দির বলতে আমরা যেমনটা বুঝি ঠিক তেমনটা নয়। ছাতুবাবুর বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে দু'পাশে দোকানপাটের মধ্যেই এই লাল রঙের মন্দির দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই ছাতুবাবু হলেন রামদুলালের ছেলে। তবে মন্দির যে অমন একটা জায়গায় রয়েছে, হঠাৎ করে তা বোঝা সত্যিই খুব মুশকিল। সামনে কাঠের প্রবেশপথ। দেওয়ালে লেখা, জয় আদি শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালী, স্থাপিত সন, ১১২৫ সাল, স্বত্বাধিকারী শ্রী মতিলাল দেব শর্ম্মা। বাংলার ১১২৫ সন অর্থাৎ ১৭১৮ সাল। ভাবা যায়, কলকাতার বুকে তিনশো বছর অতিক্রান্ত করে ফেলল এই মন্দির।

আজকের ব্যস্ত কলকাতায় এই অঞ্চল অত্যন্ত ঘনজনবসতিপূর্ন। যদিও তিনশো বছর আগে এখানে বন-জঙ্গলে ছিল। মানুষের বসবাস ছিলই না। তদানীন্তন সময়ে এই এলাকা ছিল মিত্র পরিবারের জমিদারির অধীনে। এই মন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে আজও মিত্রদের বাড়ি রয়েছে। জনৈক মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশ পেয়ে মিত্রদের জঙ্গল খুঁড়ে বসা কালীমূর্তির সন্ধান পান। পরে তিনি মিত্রদের থেকে জমি পান এবং সেখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মূর্তিটি মাটির তৈরি। গর্ভমন্দিরে শায়িত শিবের বুকে দেবী কালিকা বাবু হয়ে বসে আছেন। কলকাতার প্রাচীন কালীর মধ্যে বসাকালী একেবারেই অনন্যা ও তিনি জাগ্রত বলে শোনা যায়। কালীপুজোতে শোল মাছ দেওয়ার রীতি রয়েছে। বাড়ির তরফে আজ আর বলি দেওয়া হয় না। কিন্তু বাইরের কেউ দিতে চাইলে দিতে পারেন। জনশ্রুতি বলে, মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক সাধক পুরুষ, তিনিই একদিন স্বপ্নাদেশ পান, জঙ্গলে কালীমূর্তি রয়েছে। মা পুজো চাইছেন। পরদিন খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া যায় মা কালীর বসা মূর্তি। মূর্তিটি নিয়ে এসে স্থানীয় জমিদার মিত্রদের বদান্যতায় তিনি মায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে মায়ের পুজো আরম্ভ হয়। মায়ের নাম আনন্দময়ী তবে, মা কালী বসাকালী নামেই পরিচিত। পুরনো বাসিন্দারা কেউ কেউ বলেন সিমুলিয়া আনন্দময়ী কালী।

লাল রঙের দোতলা বাড়ির একতলায় দালান মন্দির। প্রবেশপথে কাঠের দরজা। ডান দিকে হাঁড়িকাঠ। তারপর গর্ভগৃহ, সেখানে পদ্মাসনে মা বসে আছেন মহাদেবের ওপর। মৃন্ময়ী মূর্তি। রঙ ঘন কৃষ্ণবর্ণ। নয়নাভিরাম মুখমণ্ডল প্রসন্নময়ী। লোকে বলে, মাতৃ মুখ দর্শন করলেই হৃদয় জুড়িয়ে যায়। এইজন্য দেবীর সুখ্যাতি। মায়ের কেশদাম দুই কাঁধ বেয়ে সামনে এসে পড়ে। এক মাথা এলোকেশ তাঁর পা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। মাথায় মুকুট। দেবীকে পরানো হয় সোনার জিভ। একহাতে খাড়া, অন্যহাতে অসুরের মুন্ডু। বাকি দুই হাতে অভয় মুদ্রা, বরদ মুদ্রা। মাতৃমূর্তির উচ্চতা চার ফুটের মতো। বস্ত্রহীনা মাতৃমূর্তির বাহু-প্রসারিত। প্রহরী হিসেবে দণ্ডায়মান শিবের অনুচর কালভৈরব। মায়ের মূর্তির ডান দিকে রয়েছেন মায়ের পাহারাদার। নিত্যপুজো ছাড়াও প্রতি মাসের অমাবস্যায় পুজো হয়। এছাড়াও রটন্তী কালীপুজোর দিন এবং ফলহারিনী কালীপুজোর দিন বিশেষ পুজো হয়। অমাবস্যা, অম্বুবাচী ও একাদশীতে মাকে শোল মাছ দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। মন্দিরের প্রথা অনুযায়ী অন্নভোগ ও রান্না করা মাছ আলাদা করে দেওয়া হয়। দীপান্বিতা অমাবস্যায় বসা কালী আনন্দময়ীর উৎসব পালিত হয়। কলকাতার প্রাচীন কালীর মধ্যে বসা কালী অনন্য, বাংলার অন্য কোথাও এমনটা দেখা যায় না। ভক্তরা বলেন দেবী খুবই জাগ্রত।

নবদ্বীপে পোড়ামাতলায় রয়েছেন আরও এক বসা কালী। বিরাজ করছেন বলাই শ্রেয়। সেখানে দুটি মন্দির রয়েছে। একটি ভবতারণ শিবের মন্দির, অপরটি ভবতারিণী মায়ের মন্দির। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮২৫ সালে নদীয়ার রাজা গিরীশ চন্দ্র রায় মন্দির দুটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মূর্তির প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে রয়েছে কিংবদন্তি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, একদা ভবতারিণীর মূর্তিটি নাকি গণেশের মূর্তি ছিল। নদীয়ার রাজা রাঘব রায় যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কোনও এক সময় গঙ্গার ভাঙ্গনে গণেশ মন্দির গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে যায়।

পরবর্তী কালে নদীয়ার রাজা গিরীশচন্দ্র অলৌকিকভাবে এই গণেশ মূর্তিটি উদ্ধার করেন। কিন্তু উদ্ধার করার সময় গণেশের শুঁড়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শাস্ত্র অনুযায়ী ভগ্নমূর্তির পুজো সম্ভব নয়। কিন্তু রাজা গিরীশচন্দ্র গণেশের মূর্তিটি বিসর্জন দিতেও পারছেন না। তখন নবদ্বীপের তদানীন্তন পন্ডিত সমাজের মত নিয়ে ভগ্ন গণেশ মূর্তিটিকে ধ্যান অনুযায়ী ভবতারিণী মূর্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। সেই মূর্তিই পোড়ামাতলায় ভবতারিণী মূর্তি রূপে পূজিত হয়ে আসছেন। গর্ভগৃহে মায়ের মূর্তির ওপর চাঁদোয়া টাঙানো। মায়ের মূর্তির পিছনে পুরো দেওয়ালজুড়ে রয়েছে অপূর্ব চালচিত্র। দেবী কালিকা এখানে শিবের বুকের ওপর বাবু হয়ে বসে আছেন। মায়ের চোখদুটো বিস্ফারিত। লোল জিহ্বা হলেও মা এখানেও প্রসন্নময়ী। মায়ের হাতে খড়্গ নেই। মা এখানে বসন পরিহিতা। গলায় রূপোর মুন্ডমালা। মায়ের নীচে মহাদেব হাত ও হাঁটু ভাঁজ করে কাত হয়ে শুয়ে আছেন, এমন মুদ্রায় বিরাজমান। এখানে নিত্য পূজিতা হন কালী। প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজোও হয়। বাংলা হল দেবী কালিকার আপন দেশ। সেদেশে মেয়ে কালী, আর সেখানেই তিনি অনন্য রূপে, নানা নামে, নানা ভাবে বিরাজমানা।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...