কালী কথা: কান্দির দোহালিয়ায় কালীবাড়ি, ব্যাঘ্ররূপী কালীর কৃপায় দৃষ্টি ফিরে পান অন্ধ মানুষও

আজকের কালী কথায় নবাবের জেলা মুর্শিদাবাদের কথা। মুর্শিদাবাদেই রয়েছে কিরিটেশ্বরীর মন্দির, যা একটি সতীপীঠ। দেবীর কিরিট কণা সেখানে পড়েছিল, ফলে সে জেলা যে কালী সাধনার পীঠ হয়ে উঠবে, তা কতকটা নির্ধারিতই ছিল। আজ কান্দির এক কালী মন্দিরের কথা বলব। কান্দি মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত জনপদ। প্রায় হাজার বছর ধরে মুর্শিদাবাদের কান্দির দোহালিয়ায় ব্যাঘ্ররূপী দক্ষিণাকালীর পুজো হয়ে আসছে। দেবী কালিকা এখানে শিলাখণ্ডে বাঘ রূপে বিরাজ করেন। কথিত আছে, বঙ্গের রাজা সেন বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বল্লাল সেনের আমলে এখানে এক সন্ন্যাসী ধ্যান ভঙ্গ হওয়ার পর দক্ষিণাকালীর মূর্তি দেখতে পান। তারপর থেকেই এই মন্দিরে পুজো চলে আসছে। প্রচলিত ইতিহাস বলে, এক হাজার বছর আগে বল্লাল সেনের আমলে কোনও এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী নদী পথে ভ্রমণ করছিলেন। ভ্রমণকালে তিনি কান্দিতে বসেই তপ্যসা করছিলেন। ধ্যানের সময় সেই সন্ন্যাসীর পরীক্ষা নিতে, নানা রূপ ধারণ করে তাঁর সামনে আসতে থাকেন মা কালী। ধ্যান ভাঙে, সন্ন্যাসী চোখ খুলে দেখেন, সামনে বাঘ রূপী দক্ষিণাকালী মূর্তি রয়েছে। সেই থেকে কালী পুজো হয়ে আসছে। এককালে গোটা এলাকা ছিল জঙ্গলে ঢাকা। জঙ্গলের মধ্যেই ছিল মন্দিরটি। গোটা এলাকায় ধীরে ধীরে বদল এসেছে, জঙ্গল সাফ হয়েছে, বসতি গড়ে উঠেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া এখন সর্বত্র।

IMG-20230825-WA0009

মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাহিনীর অন্ত নেই, একটি মতে কোনও এক তান্ত্রিক দোহালিয়ার জঙ্গল ঘেরা কোনও এক স্থানে মাতৃশীলা নিয়ে তপস্যা করতেন। তপস্যারত অবস্থায় তিনি দেখেন একটি বাঘকে জঙ্গলের ভিতরে চলাফেরা করছে। সেই বাঘটি সন্ন্যাসীর নৈবেদ্যের কিয়দাংশ গ্রহণ করে চলে যায়। তারপর স্বপ্নে সেই তান্ত্রিক একটি ব্যাঘ্ররূপী দেবী মূর্তি দেখেন। প্রায় একই সময় নাগাদ বাঘডাঙার রাজপরিবারের কোনও এক সদস্যও একই স্বপ্ন দেখেন। বাঘডাঙার রাজপরিবার মন্দির গড়ে তোলেন। স্বপ্নের কারণেই, মন্দিরে দেবী কালিকার মূর্তিতে ব্যাঘ্র সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

IMG-20230825-WA0011

মন্দির ঘিরে আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে। শোনা যায়, অন্য এক অন্ধ পরিব্রাজক সাধক কালী মন্দিরের গাছের তলায় তপ্যসা করছিলেন। সেই সাধকের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দক্ষিণাকালী তাঁকে দেখা দেন, এবং দক্ষিণাকালীকে দেখা মাত্র। দেবীর আশীর্বাদে পরিব্রাজক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। সেই থেকে পুজো শুরু হয়। বিভিন্ন জায়গার মানুষ মন্দিরে আসতে আরম্ভ করেন। মন্দির সংলগ্ন পুকুরে স্নান সেরে, গাছের শিকড় নেন। লোক বিশ্বাস রয়েছে কাহিনী। শোনা যায় মন্দিরে স্নান করে, গাছের শিকড় নিলে নাকি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে মন্দিরে আগত পুরোহিত, ভক্ত সকলেই এই বিশ্বাসে দেবীর পুজো করেন। কালীপুজোর রাতে দোহালিয়া গ্রামে অন্য কোনও পুজো হয় না। গ্রামের ব্যাঘ্ররুপী কালীর মন্দিরেই কেবল পুজো হয়।

রাজা লক্ষ্মন সেন ও বল্লাল সেনের আমল থেকেই কালী পুজো হচ্ছে এখানে। ব্যাঘ্ররুপী মাকালী এখানে তন্ত্র মতে পূজিত হন।

আবার এও শোনা যায় যে, বল্লাল সেনের আমলে নদীপথে যাওয়ার সময় জঙ্গলাকীর্ণ দোহালিয়াকে সাধনার জন্য উপযুক্ত মনে হতে, হঠাৎ নেমে পড়েন এক কালীসাধক এবং ধ্যানে বসেন। ব্যাঘ্ররূপী কালী মাকে পুজো আরম্ভ করেন। মা তাঁকে দেখা দেন এবং কিছু বর চাইতে বলেন। তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় শিখতে চান। তখন মা গাছের কথা বলেন। শোনা যায়, বহু বছর আগে এক গোপালক রাখাল, জঙ্গলে ঘেরা দোহালিয়া অঞ্চলে এক গাছে মা কালীর মূর্তি দেখতে পান এবং গ্রামের সবাইকে সেই মূর্তি দেখান। তারপর সেই রাখালের দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। মায়ের কাছে প্রতিকার জানতে চায়। স্বপ্নাদেশ হয় মন্দিরের দুধ পুকুরে স্নান করে, মন্দির সংলগ্ন এলাকার বিশেষ গাছের শিকড় ধারন করলে অন্ধত্ব নিরাময় হবে। রাখাল সেই মতোই করলেন এবং চোখের দৃষ্টি ফিরে পেলেন। এরপরই মায়ের মহিমা ছড়িয়ে পড়ল, তারপর থেকেই মা পূজিতা হয়ে আসছেন।

লক্ষ্মণ সেন, পণ্ডিত বনমালী সিংহের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে মুর্শিদাবাদের দোহালিয়া অঞ্চলে; তাঁকে কিছু জমি দান করেন। বনমালী সিংহ সেখানে একটি কালী মন্দির স্থাপন করেন। ১৮৯৭ সালে প্রাচীন মন্দিরটি ভেঙে, দক্ষিণমুখী মন্দির নির্মিত হয়। মন্দিরের একটি উঁচু বেদীতে ব্রহ্মশিলা প্রতিষ্ঠিত, যা দক্ষিণা কালী রূপে পূজিত হচ্ছে। শিলার গায়ে সোনার চোখ ও জিভ নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রতিবছর কালীপুজো এবং অন্যান্য তিথিতে মহাসমারোহে মন্দিরে দেবীর পুজো হয়। কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবী কালিকাকে লক্ষ্মী রূপে পুজো করা হয়, মন্দির প্রাঙ্গণে বসে মেলা। পৌষ মাসে বিপুল ভক্ত সমাগম হয়, মেলা‌ বসে। পৌষ মাসের শেষ মঙ্গলবার ও বকুল অমাবস্যা তিথিতে কান্দির দোহালিয়া কালীবাড়িতে ভক্তের ঢল নামে। মাঘী পুর্নিমায় সারা রাত ব্যাপী বিশেষ যজ্ঞ ও পুজো হয়। প্রতিদিন মায়ের নিত্য পুজো হয়। মায়ের ভোগে ভাত, বিভিন্ন রকমের ভাজা, ডাল, মাছ, পায়েস, মিষ্টি নিবেদন করা হয়। বিশেষ দিনে দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পোলাও, মাছের বিভিন্ন পদ নিবেদন করা হয়। মন্দিরে আজও বলিদানের চল রয়েছে। তবে এই মন্দির অনন্য কালী বিগ্রহকে কেন্দ্র করে, শিলাখণ্ড বাংলার বহু মন্দিরের দেবী কালিকা রূপে পূজিতা হন। কিন্তু ব্যাঘ্ররুপী কালীর দেখা কেবল এখানেই মেলে। যা বাংলার কালী আরাধনার এক অনন্য অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

  • ট্যাগ

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...