কান্না চেপে রাখার ক্ষতিকারক ফল

সক্কাল সক্কাল সেজেগুজে অফিসে এলেন আর অফিসে এসেই শুনতে হলো বসের তুমুল বকা। স্বাভাবিক মন খারাপ তো হবেই। কিন্তু আপনি যদি মেয়ে হন তাহলে আপনার কথা আলাদা। আপনি বাথরুমে গিয়ে বা নির্জন নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে কেঁদে মন হালকা করতে পারেন কিন্তু, ছেলেদের যে আবার কাঁদতে নেই। ছেলেদের কান্না আজও সমাজে এক লজ্জার বিষয় বলে ধরা হয়। তাই বুক ফাটলেও মুখ ফোটেনা অনেক পুরুষের। কিন্তু তাতেই অশনি সংকেত দেখছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে গবেষকরা। তারা জানাচ্ছেন কান্না পেলে কেঁদে নিলে মন যেমন হালকা হয় তেমনই চোখের বিশেষ কিছু উপকার হয়। দীর্ঘদিন না কাঁদার ফলে কি কি রোগ বাসা বাঁধতে পারে তা নিয়েই আজ আমাদের আলোচনা।

প্রথমে জানা যাক কাঁদলে কি কি উপকার পাওয়া যায়। কাঁদলে শরীরের থেকে কিছু টক্সিনজাতীয় পদার্থ শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। চোখের জল বা অশ্রু সাধারণত তিন রকমের হয়ে থাকে যেমন, রিফ্লেক্স টিয়ার্স, কন্টিনিউয়াস টিয়ার্স এবং ইমোশনাল টিয়ার্স।

রিফ্লেক্স টিয়ার্স চোখ থেকে ধুলোবালি এবং ধোঁয়া বের করতে সাহায্য করে অর্থাৎ চোখকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে রিফ্লেক্স টিয়ার্স।

কন্টিনিয়াস টিয়ার্স চোখকে ভেজা রাখে এবং ইনফেকশনের হাত থেকে চোখকে রক্ষা করে। এছাড়াও রয়েছে ইমোশনাল টিয়ার্স।

ইমোশনাল টিয়ার্স এর আবার আলাদা হেলথ বেনিফিট রয়েছে। চোখের জল অর্থাৎ অশ্রুর ৯৮ শতাংশ হল জল।এর ম্যধ্যে হরমোন এবং টক্সিনের পরিমান বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার মধ্য দিয়ে নিজেকে শান্তি প্রদান করা যায়। বুক থেকে একধরণের চাপ কমে যায়।

গবেষণায় প্রমাণিত কান্না প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে (পিএনএস) অ্যাকটিভেট করতে সাহায্য করে। আর এই পিএনএস শরীরকে রেস্ট দিতে এবং খাবার হজমে সাহায্য করে থাকে। দীর্ঘক্ষণ ধরে কাঁদার ফলে মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। অক্সিটোসিন খুশির হরমোন অর্থাৎ এই হরমোনের ক্ষরণের ফলে মানুষের মন খুশিতে ভরে যায়। তাই দীর্ঘক্ষণ কাঁদার ফলে মনের মধ্যে চেপে থাকা যন্ত্রণার ধীরে ধীরে উপশম ঘটে। ফুঁপিয়ে কেউ যখন কাঁদে তখন কিন্তু একদিক দিয়ে তার উপকারই হয়। কারণ যতবার সেই মানুষটি ফোঁপাবে ততবার মুখের মাধ্যমে বাতাস তার শরীরে প্রবেশ করবে ফলে ঠান্ডা বাতাসের প্রভাবে মস্তিষ্ক ঠান্ডা হবে

 

এর উপকারের কথা বলতে শুরু করে শেষ করা মুশকিল। কাঁদার প্রচুর উপকারী ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আজ আমরা আলোচনা করবো না কাঁদলে কি হয় সেই নিয়ে। অনেকক্ষেত্রেই আমাদের সমাজের বা পারিপার্শ্বিকের কথা ভেবে কান্না চেপে রাখতে হয়। আর এই কান্না চেপে রাখার ফলে ঘটে যেতে পারে চোখের নানা অসুখ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন না কাঁদার ফলে ড্ৰাই আই বা শুষ্ক চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১,০০০ মানুষ এই ড্ৰাই আইয়ের শিকার হয়েছেন। সন্দেহ করা হচ্ছে এখন থেকেই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ২০৩০ সালের মধ্যেই এই রোগ মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। জানা গেছে, চোখের সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগগুলির মধ্যে একটি হলো এই ড্ৰাই আই ডিজিজ এবং মহিলাদের তুলনায় পুরুষদেরই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি।

চিকিৎসকের জানাচ্ছেন,  বিশ্বের প্রতি ২০% মানুষের চোখে তৈরী হওয়া জলের পরিমান স্বাভাবিকের থেকে অত্যন্ত কম। তবে কোন কারণের জন্য তারা কাঁদতে পারেননা তা জানার জন্য চলছে গবেষণা। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, উত্তর ভারতের অবহেলিত রোগগুলির মধ্যে একটি হলো এই ড্ৰাই আই ডিজিজ। সময়মতো এই রোগের চিকিৎসা না করলে চোখের ক্ষতি তো হবেই এমনকি অন্ধত্ব পর্যন্ত আসতে পারে। দিনের পর দিন এই ড্ৰাই আইয়ের সমস্যা বেড়ে চলেছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকগণ। তাই আজকাল চিকিৎসকেরা নিজেরাও রোগীদের পরামর্শ দিচ্ছে প্রাণ খুলে কাঁদার জন্য। আমরা হাসির সময় যেমন মনপ্রাণ খুলে হাসি, হাসিকে যেমন চাপা দেওয়ার চেষ্টা করিনা সেরকমই সবার উচিত কান্না পেলে মনপ্রাণ খুলে কাঁদা। যদি লোকসমাজের ভয় লাগে তাহলে আপনি বাথরুম বা রেস্টরুমে গিয়ে তো কাঁদতেই পারেন। আফটার অল চোখটা তো আগে নাকি?

 

 

 

 

 

 

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...