মাতৃরূপে দুর্গা

বৈদিক সাহিত্য মতে বৈদিক যুগে একটি যজ্ঞবেদী ছিল। নাম দক্ষ-তনা। শোনা যায় রাজা দক্ষ অনেক যজ্ঞ করেছিলেন এই বেদীতে। পরবর্তীতে এই দক্ষ-তনা শব্দবন্ধটি পরিবর্তিত হয়ে দক্ষ-তনয়া এই শব্দবন্ধে পরিণত হয়।

যজ্ঞ-বেদীর সঙ্গে সবচেয়ে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জুড়ে থাকে আগুন বা অগ্নি। তারা সর্বদা একে অপরকে আলিঙ্গন করে থাকে। বলা হয়ে থাকে অগ্নিরূপে মহাদেব আর দক্ষ-তনয়া সব সময় পাশাপাশি থাকেন। এই সাহিত্যের ব্যাখ্যা ধীরে ধীরে শিব-দুর্গার বিয়ের গল্পের রূপ পেয়েছে।

বৈদিক যুগের মত অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে বেদীকে পুজো করতেন ঋষিরা। কখনো এই বেদীতে আগুন জ্বালিয়ে ঋষিরা পুজো করতেন। পবিত্র আগুনের সামনে সমপর্ণের সাধনা।   মূলত শক্তির আরাধনা করতেন । শোনা যায় ধীরে ধীরে আগুন নষ্ট হবার সম্ভাবনা এবং আগুনের স্থায়িত্বের সীমাবদ্ধতার ভাবনা থেকে ঋষিরা বদলে ফেলেন তাঁদের পুজোর ধরন। পরবর্তীকালে তাঁরা একটি মূর্তি তৈরি করে পুজো করতে শুরু করেন। এই মূর্তির নানা ভাবে বিবর্তন হয়েছে। দশভূজা দেবী দুর্গা আসলে ঋষিদের তৈরি করা সেই মূর্তিরই বিবর্তিত রূপ।

শুরুর দিকে এই মূর্তিকে ঋষিরা অগ্নিরূপে কল্পনা করে নিতেন। তাঁরা ভাবতেন তাঁদের নিবেদিত অর্ঘ্য অর্থাৎ তাঁদের হব্য এই আগুনের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোচ্ছেন। তাই এই মূর্তিকে তাঁরা বলতেন হব্য-বাহিনী। সময় যত এগিয়েছে এই মূর্তি ক্রমে ক্রমে দশভূজা রূপ নিয়েছে।

যজ্ঞবেদীর দশ দিক থেকে দেবীর দশটি হাত কল্পনা করে নেওয়া হয়েছে। যেমন বেদী আর অগ্নি অচ্ছেদ্য তেমনই অগ্নি আর দুর্গা অভিন্ন রূপেই ধরা দেয়। বৈদিক যুগের শেষ দিক থেকে দেবী-মূর্তিকে উমা হিসেবে কল্পনা করা হতো। তখন দক্ষ তনয়া ছিলেন উমা। এই উমা থেকেই উৎপত্তি হয়েছিল অম্বিকার। অম্বিকা বিবর্তিত হয়ে দুর্গা রূপে সৃষ্টি হয়।

অগ্নিকুণ্ডে দেবীর পাশে অনেক ছোট ছোট মূর্তি রাখা থাকতো। এই সবই কিন্তু ঋক-বেদের নিয়মে দুর্গাপুজো। কাদের কল্পনা করা হত এই ছোট ছোট মূর্তি রূপে? একজন যোদ্ধা থাকতেন যিনি অগ্নিকুণ্ডকে রক্ষা করতেন। অন্য আরেকজন পুজোর সূচনা করে দিতেন। পুজো মানে এখানে যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। যিনি যজ্ঞের সূচনা করতেন তাঁর চারটে হাত কল্পনা করা হতো। আরেকজন ছিলেন যজ্ঞের জ্ঞানদাত্রী। অন্য আরেকজন যজ্ঞ পরিচালনা করার জন্য অর্থাগমের ব্যবস্থা করতেন। এভাবেই দেবীর সন্তান অর্থাৎ লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী এঁদের উদ্ভব হয়েছিল। তবে এ সবটাই ঋকবেদের মতে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে সব ঘটনাবলী বিবর্তিত হয়েছে।

অর্থাৎ হব্য-বাহিনীর মূর্তি এবং তাঁর চারপাশে থাকা দেবমূর্তির ইতিহাস বৈদিক যুগের দশভূজা দুর্গার প্রতিরূপ। আর বেদীতে উপস্থিত বাকি ছোট ছোট মূর্তিগুলি দেবীর সন্তানের প্রতিরূপ।

ঋকবেদের মত অনুযায়ী এই অগ্নিকুণ্ডে অসুরদের বলি দেওয়া হতো। এভাবেই ঋকবেদের সময় থেকে দেবী দুর্গা, তার সন্তান এবং অসুরের রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তবে পুরাণ মতে দেবী দুর্গার নানা রূপ রয়েছে। দেবী দুর্গা মূলত শক্তির দেবী। লক্ষ্মী, সরস্ব,তী কার্তিক, গণেশ তাঁর সন্তান। পুরাণ মতে দেবীর প্রত্যেকটি সন্তান এইরকমই শক্তির উৎস। দেবী সন্তানদের আগলে রেখেছেন।

ঈশ্বরের আরাধনা আসলে শক্তির আরাধনা। দেবীর তেজ ও শক্তি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর সন্তানদের। তাই মাতৃ রূপে দুর্গা আসলে বাস্তবের দুর্গার সঙ্গে কোথাও মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।

তিনি সন্তানদের অন্যায়ের শাস্তি দিয়েছেন, প্রয়োজনে শাসন করেছেন। আবার কখনো পাশে দাঁড়িয়ে রুখে দিয়েছেন তাঁদের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়। তাই কার্তিকের মত সুপুরুষ আর গণেশের মতো এক সাধারণ, মর্ত্যের সন্তানসুলভ দেবতাও দেবীর সন্তান রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। সবটাই আসলে শক্তি এবং ভালোবাসার সাধনা। মাতৃ-রূপে দুর্গার আরাধনা আসলে সেই সাধনাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করা। এভাবেই যুগ যুগ ধরে দেবীর আরাধনা কোথাও তাঁকে ঈশ্বরের সিংহাসনে বসিয়ে রেখেও চিন্ময়ী মা হিসেবে উপস্থাপিত করেছে।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...