অন্নদামঙ্গল থেকে বঙ্গে দেবী অন্নপূর্ণার প্রসার

কৈলাসে একদিন মহাদেব পার্বতীকে বললেন, ‘ জগৎ মায়ার অধীন। সবই মায়ার রচনা। এমনকি অন্নও’। মহাদেবের কথা শুনে ভীষণ রেগে গেলেন পার্বতী। তিনি বললেন, সবই যখন মায়া তখন আমার আর থেকে লাভ কী! আজ থেকে আমি বিদায় নিলাম!’ এই বলে দেবী অদৃশ্য হলেন। দেবী পার্বতীর আর এক রূপ অন্নপূর্ণা। তিনি অন্নের ঈশ্বরী। তাঁর অন্তর্ধানে ত্রাহি রব উঠল ত্রিলোক জুড়ে। কৈলাসও বাদ পড়ল না। শেষ পর্যন্ত ভক্তদের দুরবস্থা দেখে দেবী কাশী নামক স্থানে ফের আবির্ভুতা হলেন। স্বহস্তে পরমান্ন রেঁধে খাওয়াতে লাগলেন দীন দরিদ্র মানুষকে। একদিন ভোলা মহেশ্বরও তাঁর দলবল নিয়ে ভিক্ষাপাত্র মেলে ধরলেন দেবীর সামনে। শোনা যায়, দেবীর হাতের কাঁকন দেখে মহেশ্বর সেই মুখঢাকা রমণীকে চিনতে পেরেছিলেন।

শাস্ত্র মতে এই দেবী ত্রিনয়না। রক্তাভ মুখবর্ণ। চতুর্ভুজা। উপরের দুহাতে অভয় মুদ্রা |বাঁ দিকের নিচের হাতে পরমান্নপূর্ণ পাত্র। ডান হাতে ধরা হাতা। অনেক জায়গাতেই তাঁর সঙ্গে থাকে মহাদেবের মূর্তি। সঙ্গে নন্দী এবং ভৃঙ্গি। দেবীর মস্তকে বিরাজিত অর্ধচন্দ্র।তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন। তবে মহাগৌরী অন্নপূর্ণা রূপে কীভাবে কাশীবাসী হলেন সে নিয়ে একাধিক কাহিনী প্রচলিত আছে।

বারাণসীর কাশী দেবীর আপন ঘর। তাঁর কাজ অন্নভান্ডার সামলানো। তাঁর কৃপাতেই অন্ন পানে বেঁচে থাকে মানুষ। পুরাণ মতে চৈত্রমাসে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে কাশীতে তিনি আভির্ভূত হয়েছিলেন । সেই সূত্রে এই তিথিতে দেবী অন্নপূর্ণার বাৎসরিক পুজো অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা দেশে দেবী অন্নপূর্ণার জনপ্রিয়তা বাড়ে রায় গুনাকর ভারচন্দ্রের লেখা অন্নদামঙ্গল কাব্য থেকে। নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।

এক কালে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতেও এই পুজো হত। দেবী অন্নদার কৃপা প্রাপ্ত হয়ে ভবানন্দ মজুমদার জাহাঙ্গীরের কাছে রাজা উপাধি পেয়েছিলেন। অন্নদামঙ্গলকাব্য অনুযায়ী দনবাব মুর্শিদকুলি খাঁয়ের কাছে নির্ধারিত দিনে কর বা রাজস্ব মেটাতে না পেরে দুর্গাপুজোর সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদে কারারুদ্ধ হন। সেই সময়ে দেবী অন্নপূর্ণা রাজাকে দর্শন দিয়ে তাঁর মূর্তি পুজো করতে বলেছিলেন। সেই থেকেই পুজোর প্রচলন হয়। যা আজকের চেহারা নিয়েছে।

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...