সতীপীঠঃ আরাসুর পাহাড়ে আছেন শ্রীরাম-শ্রীকৃষ্ণের পূজনীয়া রহস্যময়ী দেবী ‘অম্বা’

গুজরাট রাজ্যের বনাসকাঁঠা জেলা। এখানে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী, আর রয়েছে আরাবল্লী পর্বতমালার আরাসুর পাহাড়। আমেদাবাদ শহর থেকে একশো পঁচাশি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড়। তারই শীর্ষে রয়েছে দেবী সতীর একান্নপীঠের অন্যতম এক পীঠ। এই পীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে স্থানীয় মানুষেরা ‘অম্বাজি’ নামে অভিহিত করেন। দেবীর মন্দিরকে বলেন ‘আরাসুরী অম্বাজি মন্দির’।

পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শনে কর্তিত হয়ে দেবী সতীর দেহ একান্নটি অংশে বিভক্ত হয়ে নানাস্থানে পতিত হয়েছিল। এই একান্ন-অঙ্গের পতনস্থান পুরাণ ও তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে ‘একান্নপীঠ’ হিসেবে পরিকীর্তিত হয়েছে। শোনা যায়, আরাসুর পাহাড়ের যেখানে অম্বাজি মন্দির রয়েছে, সেখানে পতিত হয়েছিল দেবী সতীর হৃদয়। অনেকেই আবার সতীঅঙ্গ ‘হৃদয়’-এর পতনের স্থান হিসেবে অন্যস্থানের (‘খেড়ব্রহ্ম’) কথা বলেন। যাই হোক, সতীঅঙ্গ ভূমিতে পতনের পরই শিলায় পরিণত হয়েছিল।

পীঠমন্দিরের গর্ভগৃহে অবশ্য দেবীঅঙ্গের শিলা নেই, এমনকি কোন দেবীমূর্তিও নেই। তার পরিবর্তে পূজিত হয় একটি ‘শ্রীযন্ত্র‘। এখানে এভাবে কেন দেবী পূজিত হন, কেন এখানে দেবীঅঙ্গের শিলা দেখা যায় না—তার উত্তর রয়েছে স্থানীয় একটি কিংবদন্তীতে। সেটি হলঃ

দেবীর অঙ্গ এখন যেখানে মন্দির রয়েছে, সেখানে পতিত হয়নি, পতিত হয়েছিল ‘খেড়ব্রহ্ম’ নামক স্থানে। দাঁতা রাজ্যের মহারাজ সেই পীঠে দেবীর আরাধনা করতেন। কিন্তু কোন এক কারণে দেবী মহারাজের প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর রাজ্য ত্যাগ করতে সংকল্প করেন। তখন স্বপ্ন দেন পাশের আরাবল্লী-অধ্যুষিত রাজ্যের মহারাণাকে। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মহারাণা ভারি আপ্লুত হলেন এবং দেবীস্থানে গেলেন দেবীকে পূজায় তুষ্ট করে আপন রাজধানীতে আবাহন করতে। দেবী তাঁর উপাসনায় তুষ্ট হলেন। সঙ্গে আসতেও উদগ্রীব হলেন। কিন্তু তবুও মহারাণার সামনে রাখলেন একটি সহজ শর্ত। বললেন, দেবী মহারাণার পিছন পিছন হেঁটে হেঁটে যাবেন, কিন্তু রাজধানীতে পৌঁছনোর আগে কিছুতেই মহারাণা পিছন ফিরে তাকাতে পারবেন না। আপ্লুত রাজা ভাবলেন, এ আর এমন কী! অমনি শর্তে রাজি হয়ে গেলেন।

কথামতো মহারাণা চলেন আগে আগে। দেবী চলেন তাঁর পিছু পিছু। দেবীর পায়ের নূপুর চলার ছন্দে রুনুঝুনু বাজছে। মহারাণা তাই শুনে পিছন না-ফিরেও বুঝতে পারছেন যে, দেবী ঠিক তাঁর পিছু পিছু আসছেন। এবার সামনে এলো আরাবল্লীর পর্বতশ্রেণি, তাকে অতিক্রম করতে মহারাণা উঠলেন আরাসুর পাহাড়ে। তখন হঠাৎ মহারাণা খেয়াল করলেন যে, কই আর তো দেবীর পায়ের নূপুর শোনা যাচ্ছে না! তাহলে কী দেবী পাহাড়ে তাঁর পিছু পিছু আসছেন না! এমন আশঙ্কা মনের মধ্যে চেপে বসতেই মহারাণার মতিচ্ছন্ন হল, তিনি পিছনে তাকিয়ে ফেললেন। আর তাকিয়ে ফেলতেই বুঝলেন তিনি কী সর্বনাশ করে ফেলেছেন! দেখলেন, দেবী তাঁর পিছনে ঠিকই আসছিলেন, কিন্তু দেবীর বসন গুল্মের ডালে আটকে যাওয়ায়, দেবী খানিক থেমে তা নিজের হাতে ছাড়িয়ে নিচ্ছিলেন, এজন্যই দেবীর পায়ের নূপুরের শব্দ মহারাণা শুনতে পাননি!

যাই হোক, মহারাণা তো দেবীর শর্ত ভঙ্গ করে ফেলেছেন! কাজেই দেবী তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এবার মহারাণার আপসোস করা ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে তাঁর দু’চোখ ভরে জল এলো। তিনি বুক চাপড়ে বিলাপ করতে লাগলেন। ভক্তের এমন অবস্থা দেখে দেবীর দয়া হল। দেবী তখন দৈববাণী করে বললেন যে, যেখানে তিনি অদৃশ্য হয়েছেন, সেখানেই পীঠমন্দির নির্মাণ করে মহারাণা পূজা করুন, তাতে তাঁর ও তাঁর রাজ্যের মঙ্গল হবে। তখন দেবীর আদেশ মাথায় নিয়ে আরাসুর পাহাড়ে দেবীর পীঠমন্দির নির্মাণ করে পুজো শুরু করলেন মহারাণা।     

দেবী যেহেতু অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন, তাই মহারাণা দেবীর কোন মূর্তি নির্মাণ করাননি। দেবীর প্রতীকস্বরূপ মার্বেল পাথরে ‘শ্রীযন্ত্র’ ও বৈদিকমন্ত্র উৎকীর্ণ করে পূজা করতে থাকেন। প্রচলিত বিশ্বাস, দেবী যেহেতু অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন, তাই দেবীর প্রতীক এই যন্ত্রও চর্মচক্ষে দেখা উচিত নয়। পুরোহিত যাতে এই যন্ত্র দেখে না-ফেলেন, সে-জন্য চোখে পট্টি বেঁধে দেবীস্থানে আসেন, শৃঙ্গার করেন ও পুজো করেন। সাধারণের চোখ যাতে এই যন্ত্রে না-পড়ে, সেই জন্য ফুল, বস্ত্র-ওড়না, মুকুট প্রভৃতি দিয়ে যন্ত্রের ওপর দেবী অম্বার সবাহনা মূর্তি রচনা করা হয়। দেবীর এক-একদিন একেকরকম বাহন দেখা যায়—সোমবারের বাহন নন্দী, মঙ্গলবারের বাহন বাঘ, বুধবারের বাহন হাতি, বৃহস্পতিবারের বাহন গরুড়, শুক্রবারের বাহন হাঁস, শনিবারের বাহন হাতি। সাতদিনের পূজা-পদ্ধতিও আলাদা আলাদা। যন্ত্রের সামনে একটি প্রদীপ জ্বলে অখণ্ডজ্যোতিতে। তার আলো-আঁধারি ছটায় অদ্ভুত এক রহস্যময়তা তৈরি হয়।

এই দেবী ও দেবস্থান নিয়ে কিংবদন্তির শেষ নেই। এখানে যেহেতু দেবীর কোন মূর্তি নেই, তাই অনেকের অনুমান যে, এই দেবস্থান পূর্ব-বৈদিক যুগের, যখন হিন্দুদের মধ্যে মূর্তিপূজা প্রচলিত হয়নি। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, এই দেবীর সামনেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ‘মুণ্ডন’ বা বাল্যের চুলদান সংস্কার সম্পন্ন হয়েছিল। আর-একটি কিংবদন্তিতে বলা হচ্ছে যে, বনবাসে এসে দেবী সীতাকে হারিয়ে তাঁর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণ এই দেবীস্থানে আসেন এবং দেবীকে পুজো করে আশীর্বাদ লাভ করেন।     

দেবীর আসল মন্দিরটি হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। ঐতিহাসিকদের অনুমান, সূর্যবংশী রাজা অরুণ সেন খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে এই মন্দির নির্মাণ করান। অবশ্য সেই মন্দির এখন আমূল বদলে গেছে। কেননা, প্রাচীন মন্দিরের অনেক অংশই কালের গতিকে নষ্ট হতে শুরু করেছিল। ১৯৭৫ সালে মন্দিরট্রাস্টি ও রাজ্য সরকারের উদ্যোগে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে মন্দিরটির সংস্কারের কাজ শুরু হয় এবং ক্রমে আমূল সংস্কার সাধিত হয়। মন্দিরটিকে আকারে-আয়তনে বাড়ানো হয়, সুন্দর সুন্দর নক্সা ও অপূর্ব সব ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়। তাতে ইতিহাস হয়তো ঢাকা পড়ে গেছে, কিন্তু বর্তমানের মন্দিরটি হয়ে উঠেছে নয়নাভিরাম। এই সংস্কারের সময়ই মন্দিরের শীর্ষে তিনশো আটান্নটি সোনার কলস স্থাপন করা হয়। এতে মন্দিরের শোভা ও আভিজাত্য কয়েকগুণ বেড়েছে।

মন্দিরটি যেহেতু পাহাড়ের উপর অবস্থিত, সেহেতু দর্শনার্থীদের মন্দিরে যেতে অনেকটাই চড়াই অতিক্রম করতে হয়। পার হতে হয় একশো এগারোটি সিঁড়ি। মন্দিরের চারপাশ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মূল প্রবেশদ্বারটি ছোট। এই দ্বারটি প্রাচীনকাল থেকে এমনই রয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে, এর পরিবর্তে বড় দ্বার বা এর পাশাপাশি দ্বিতীয় দ্বার নির্মাণ দেবীর ইচ্ছার বিরুদ্ধ-ব্যাপার; তাই অন্যদ্বার তৈরি করা হয়নি, প্রাচীন ছোট দ্বারটিই সযত্নে রক্ষিত হয়ে চলেছে। মন্দিরের চারপাশের অঙ্গনকে বলা হয়, ‘চাঁচর চক’; এখানে যজ্ঞাদিকর্ম অনুষ্ঠিত হয়। মন্দিরটি সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত। মন্দিরের গর্ভগৃহের মাথায় রয়েছে সুউচ্চ সোনার রঙের চূড়া। চূড়ায় রয়েছে সুদীর্ঘ লাল পতাকা। গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য রুপোয় মোড়া দরজা রয়েছে। দরজা দিয়ে প্রবেশ করেই সম্মুখের দেওয়ালে একটি তাকের মতো দেখা যায়। তার নীচেই প্রাচীন মার্বেল পাথরের শ্রীযন্ত্রটি স্থাপিত রয়েছে।

ভাদ্রভি বা ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায় প্রতি বছর এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে দারুণ একখানা মেলা বসে। এছাড়াও এই মন্দিরে খুব ধুমধামের সঙ্গে দুর্গা পুজো ও নবরাত্রি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত হয় বিশেষ পূজা। এইসব উৎসব ও পূজা উপলক্ষ্যে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তজনের ঢল নামে। তাদের অনেকেই উপবাসের মধ্য দিয়ে ব্রতপালন করেন। বলা বাহুল্য, এইসব উৎসবের সময় সমস্ত মন্দির নানাবিধ ফুল ও আলোর অপরূপ সজ্জায় সেজে ওঠে। এই পীঠমন্দিরের প্রাচীনতা, দেবীর মাহাত্ম্য, শান্ত-সৌম্য রূপকল্পনা ভক্তজনের মনপ্রাণ প্রশান্তিতে একেবারে ভরিয়ে দেয়। শোনা যায়, সারা বছর এই মন্দিরে প্রায় নব্বই লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে।  

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...