মহামায়া দেবীর খোঁজ মেলে বাঁকুড়া জেলার রাইপুর নামক গ্রামে

তত্ত্বপ্রকাশিকা টীকা অনুযায়ী মহামায়াই হল "অঘটন-ঘটন-পটীয়সী ব্রহ্মাত্মিকা শক্তি"। হিন্দুদের বিশ্বাস ঈশ্বর সৃষ্টি, পালন, সংহার ও জন্ম লীলা প্রভৃতি কার্য এই মহাশক্তির সাহায্যেই সম্পাদন করেন। আর এই মহাশক্তিই দুর্গা,কালী,জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি নামে ও রূপে ভক্তদের দ্বারা পূজিতা হয়ে থাকেন।

দেবী ভাগবত গ্রন্থে মহামায়া'কে ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবতী নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রুদ্রযামল তন্ত্রগ্রন্থেও মহামায়াকে পরমব্রহ্ম বলা হয়েছে। মহামায়ার আদি রূপের সৃষ্টির রহস্য সন্ধান করতে গেলে, প্রবেশ করতেই হয় মহাভারতের যুগে। দেবী দুর্গার সৃষ্টির রহস্য বাঙালিকে চিরকাল মোহময় ও আকৃষ্ট করে তুলেছে। কিংবদন্তি আছে, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস বেদসংকলন, মহাভারত, পুরাণ, ব্রহ্মসূত্র রচনা করেছিলেন।

ঋকবেদে দুর্গা বা মহামায়ার পূর্ণরূপের কোনও পরিচয় পাওয়া না গেলেও 'দেবীসূক্ত'কে দেবী দুর্গার সূক্ত বলেই মনে করা হয়েছে। দেবী দুর্গা নির্গুণ অবস্থায় এই জগৎ সংসারে বিরাজমান। সেখানে দেবীর জন্ম নেই আবির্ভাব আছে, একে বলা হয় 'প্রাকত্ব'। এখানে এই দেবী সমস্ত দেবতাদের ত্বেজপুজ্ঞের সমষ্টি স্বরূপ। এই ভাবে দেখা যায় মহামায়া আমাদের অসুরদলনী দুর্গার এক প্রচন্ড রূপ হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছেন বরাবর। কিন্তু হিন্দুমতে এক একটি নাম দেবীর অন্য একটি রূপ কে বিশেষভাবে প্রকাশ করে। সেইভাবেই মহামায়া দেবীর এক অন্যরকম প্রকাশ দেখতে পাই আসামে।

মহামায়া ধাম অথবা বোগড়িবাড়ির মহামায়া মন্দির, ধুবড়ী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিমি পূর্বদিকে এবং বিলাসীপাড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কিমি পশ্চিমদিকে অবস্থিত মহামায়া ধাম অথবা বোগড়িবাড়ির মহামায়া মন্দির, ধুবড়ী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিমি পূর্বদিকে এবং বিলাসীপাড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কিমি পশ্চিমদিকে অবস্থিত একটি মন্দির, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য এই মন্দিরটিকে ৫২টি শক্তিপীঠ এর অন্যতম হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এই মন্দিরটি গুয়াহাটিতে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির এর পর পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছে দ্বিতীয় আকর্ষণীয় মন্দির। বিশ্বাস করা হয় যে পর্বতজোয়ার জাতির লোকেরা  ঐতিহ্যগতভাবে এই মহামায়া দেবীর পূজা করতেন। এছাড়া পর্বতজোয়ারের জমিদারদের প্রধান উপাস্য ছিল এই দেবী।

পরবর্তীতে এই দেবী সার্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করে এবং বর্তমানে নিম্ন আসামের প্রায় সকল হিন্দুই এই দেবীর পূজা করে থাকে। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য এই মন্দিরটিকে ৫২টি শক্তিপীঠ এর অন্যতম হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে পর্বতজোয়ার জাতির লোকেরা ঐতিহ্যগতভাবে এই মহামায়া দেবীর পূজা করতেন। এছাড়া পর্বতজোয়ারের জমিদারদের প্রধান উপাস্য ছিল এই দেবী। পরবর্তীতে এই দেবী সার্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করে।

আর এক জাগ্রত মহামায়া দেবীর খোঁজ মেলে বাঁকুড়া জেলার রাইপুর নামক গ্রামে। বেশিরভাগ জায়গায় দেখা যায় কোনও দেবদেবী সম্পর্কে সেই এলাকায় এক অলৌকিক প্রভাবের গল্প রয়ে গেছে, এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। এখানে দেখা যায় মা মহামায়ার মন্দির প্রাঙ্গনের কাছেই রয়েছে পবিত্র জলাশয় 'আলম সায়র'।

কথিত আছে এই পুকুরপাড়েই মানবীরূপ ধারণ করে মা মহামায়া বিষ্ণুপুরের চিনু শাঁখারির নিকট পরেছিলেন শাঁখা।

এক নিস্তব্ধ দুপুরে বিষ্ণুপুর থেকে আগত চিনু শাঁখারি  শাঁখা নেবে গো হাঁক দিয়ে হেঁটে চলেছেন। মহামায়ার মন্দির সংলগ্ন পুকুরপাড়ে আসতেই এক সুন্দরী রমণী শাঁখা পরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন চিনু শাঁখারির নিকট। পথপ্রান্তরে একাকিনি রমণীর হাতে শাঁখা পরাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন চিনু শাঁখারি। কিন্তু সেই কন্যা জানায় সে এখানেই শাঁখা পরবে। অনেক টালবাহানার পর চিনু শাঁখারি বাধ্য হন শাঁখা পরাতে। শাঁখা পরানো তো হল, এবার মূল্য দেওয়া নেওয়ার পালা। সেই কন্যা জানায় তার কাছে তো পয়সা নেই। এই মন্দিরের পুরোহিত আমার বাবা। গিয়ে বলুন আপনার মেয়ে শাঁখা পরেছে, কুলুঙ্গিতে পয়সা আছে, দিন। চিনু শাঁখারির মন খারাপ হয়ে গেল। অগত্যা চিনু শাঁখারি  পুরোহিতের বাড়ি পৌঁছলেন। পুরোহিত মহাশয়ের নাম ধরে হাঁক দিতেই বেরিয়ে এলেন এক সন্ন্যাসী। চিনু শাঁখারি বললেন, আপনার কন্যা ওই পুকুরপাড়ে শাঁখা পরেছে, কুলুঙ্গিতে পয়সা রাখা আছে, মূল্য হিসাবে ওটা আমাকে দিন। পুরোহিত আশ্চর্য হয়ে জানায়, কি বলছেন আপনি, আমার তো কোন মেয়ে নেই!

চিনু শাঁখারি বলেন, কী কথা বলছেন আপনি?  দুজনের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল। অবশেষে পুরোহিত ঘরে ঢুকে দেখেন কুলুঙ্গিতে পয়সা রাখা আছে। কিন্তু এ পয়সা এখানে রাখল কে?

বাইরে বেরিয়ে এসে শাঁখারিকে বলেন, কুলুঙ্গিতে পয়সা তো আছে, কিন্তু আমাকে দেখাবেন চলুন কে এবং কোথায় শাঁখা পরেছিল। দুজনেই পুকুরপাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। চিনু শাঁখারি কাতর স্বরে হাঁক দিতে লাগলেন তুমি শাঁখা পরে কোথায় চলে গেলে মা?  তোমার বাবা আমাকে মিথ্যুক বলছেন, বলছেন তাঁর নাকি কোন মেয়ে নেই। মা দেখা দাও, আমি শাঁখার দাম পাচ্ছি না।

এমন সময় পুকুরের জলের তলা থেকে শাঁখাপরা দুটো হাত উঠে এল এবং কয়েক মুহূর্ত পর আবার জলের তলায় চলে গেল। দুজনেই হতবাক। পুরোহিত মহাশয় বলেন কী সৌভাগ্য আমার, মা মহামায়া আমার কন্যারূপে শাঁখা  পরেছেন, চলুন আপনার শাঁখার মূল্য দিই। চিনু শাঁখারি বলেন, ও পয়সা আমি আর নেব না। স্বয়ং মা মহামায়াকে আমি নিজ হাতে শাঁখা পরিয়েছি, এমন সৌভাগ্য ক'জনের হয়! আমি শাঁখার দাম তো নেবই না, যতদিন আমার বংশ থাকবে ততদিন দুর্গাপূজায় মায়ের জন্য শাঁখা আসবে।

তারপর থেকে প্রতিবছর এই নিয়মেই বহাল রয়েছে। আজও পর্যন্ত তার কোনও অন্যথা হয়নি। এমনকি রাইপুর নামক স্থানে এই মহামায়ার মন্দির থাকার কারণে অনেকদিন অব্দি এখানে দেবী দুর্গার কোনও প্রতিমা করা হতো না। পরিবর্তিতে এখানে বাজার এলাকায় ঠাকুর প্রতিমা করে পুজো হচ্ছে। তবে মহামায়া দেবীর নাম মাহাত্ম্য আজও অমলিন। সেখানে এলাকার অনেক শুভকার্য অনুষ্ঠান, এই মন্দিরে হয়ে থাকে।

নিবন্ধকারঃ রাহুল কর  

 

এটা শেয়ার করতে পারো

...

Loading...